নিজস্ব প্রতিবেদক, দৈনিক পূর্বাচল:
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের টানাপোড়েন নিরসনে ও দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনা কমাতে শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে বসতে রাজি হয়েছে ইরান। তবে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সংলাপ বা আলোচনার আগে তেহরানের পক্ষ থেকে তিনটি সুনির্দিষ্ট শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে এই শর্তগুলো ইতিমধ্যেই মার্কিন প্রশাসনের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি মহসিন রেজাই।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘আল জাজিরা’কে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে ইরানের আলোচনার এই শর্ত, যুক্তরাষ্ট্রের মোকাবিলায় তেহরানের কৌশল এবং সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতির বিভিন্ন দিক নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন তিনি।
ইরানের ৩টি প্রধান শর্ত
মহসিন রেজাই জানান, কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে তাদের কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে এবং তাদের মাধ্যমেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মূল শর্তগুলো পাঠানো হয়েছে। ইরানের শর্তগুলো হলো: ১. সব ফ্রন্টে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি: মধ্যপ্রাচ্যসহ সংঘাতের সব এলাকায় অবিলম্বে এবং চিরতরে যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। ২. সম্পদ অবমুক্তকরণ: বিদেশে আটকে থাকা বা জব্দ করা ইরানের সব আর্থিক সম্পদ দ্রুত ও নিঃশর্তে ছাড় করতে হবে। ৩. নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার: ইরানের ওপর থেকে সব ধরনের অবৈধ নৌ-অবরোধ বা সামুদ্রিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে।
রেজাই স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের পশ্চিমা মিত্ররা এই শর্তগুলো মেনে নিলেই কেবল যুদ্ধ বন্ধ করে পরবর্তী রাজনৈতিক আলোচনার ধাপে যাওয়া সম্ভব। ওয়াশিংটনের জন্য বর্তমান সংকট থেকে বের হয়ে আসার এটাই সবচেয়ে সুবিধাজনক পথ বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোনো ধরনের হুমকি বা চাপ ইরানকে দমাতে পারবে না বলে হুংকার দেন তিনি।
ট্রাম্পের মূল্যায়ন ভুল ও ইসরায়েলের প্ররোচনা
সাক্ষাৎকারে মহসিন রেজাই আরও অভিযোগ করেন যে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অন্ধ প্ররোচনা ও উসকানিতেই ওয়াশিংটন এই অপ্রয়োজনীয় সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। ইরানকে ঘিরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের সব হিসাব-নিকাশ ও কৌশলগত মূল্যায়ন ভুল ছিল বলেও দাবি করেন তিনি। মার্কিন সামরিক বাহিনীর বর্তমান দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে তেহরানের পরিষ্কার ধারণা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যেকোনো সময়ের তুলনায় মার্কিন বিমান অভিযান ও আগ্রাসন মোকাবিলায় ইরান এখন অনেক বেশি শক্তিশালী ও প্রস্তুত।
কড়া হুঁশিয়ারি ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতি
ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত সুরক্ষিত এবং ইস্পাতকঠিন উল্লেখ করে রেজাই চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যদি এরপরও ইরানের ওপর কোনো ধরনের সামরিক আগ্রাসন চালানো হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটি এবং ওয়াশিংটনের সব কৌশলগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোতে আরও কঠোর ও তীব্র পাল্টা হামলা চালানো হবে।
এছাড়া সাক্ষাৎকারে সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সংঘাতের বিষয়টিও উঠে আসে। রেজাই জানান, ইরান চায় সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যকার চলমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান হোক। একটি সম্মানজনক চুক্তির মাধ্যমে হুথিরাও এই সংকটের স্থায়ী সমাধান চায় বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই নতুন কূটনৈতিক পজিশন এবং ৩টি শর্ত মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি সংকট নিরসনে নতুন কোনো মোড় নেয় কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।


