দৈনিক পূর্বাচল বিশেষ প্রতিবেদন
কক্সবাজারে ভেঙে চুরমার নিউজিল্যান্ডের নাগরিকের প্রবাসজীবন: সাগরে নৌকাডুবিতে প্রাণ হারাল ১৬ বছরের কিশোর আলবার্ট
নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার:
নিউজিল্যান্ডে ফেরার স্বপ্ন নিয়ে বঙ্গোপসাগরের বুকে পাড়ি জমানোর আগেই সব শেষ হয়ে গেল ৭৪ বছর বয়সী জন এডওয়ার্ড পাডনি ও তার পরিবারের। বাঁকখালীর মোহনা পেরিয়ে গভীর সমুদ্রে এগোনোর সময় উত্তাল ঢেউয়ের আঘাতে দুই টুকরো হয়ে যায় তাদের তৈরি আটান্ন ফুট লম্বা কাঠের ক্যাটামারান বা হাউজবোট ‘আইল্যান্ড গার্ল’। এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় জনের ষোলো বছরের ছোট ছেলে আলবার্ট প্রাণ হারিয়েছে। কক্সবাজারের নাজিরারটেক উপকূলের বালুচরে এখন কেবলই পড়ে আছে একটি পরিবারের ভাঙা স্বপ্নের অবশিষ্টাংশ।
ঘটনার দিন সকালে সমুদ্র শান্ত থাকলেও ক্যাটামারানটির জোড়া লাগানো অংশে ফাটল ধরতে শুরু করে। দুই খোলের এই জলযানটিকে ভারী কাঠের গুঁড়ি দিয়ে জোড়া দেওয়া হয়েছিল। ঢেউয়ের তেজ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাঠের গুঁড়িগুলো ভেঙে যায় এবং এক বিশাল ধাক্কায় নৌকাটি দুই টুকরো হয়ে যায়। সাঁতার না জানা জন ভাঙা নৌকার টুকরো ধরে ভেসে থাকলেও, তার স্ত্রী বেলা ও দুই ছেলে পানিতে ছিটকে পড়েন। পরে বেলা ও রালফকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও নৌকার ছাউনির নিচে আটকে থাকা আলবার্টকে বাঁচানো যায়নি। কয়েক দিন পর কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাছে তার মরদেহ ভেসে ওঠে।
দেড় কোটি টাকার প্রজেক্ট ও দীর্ঘ প্রস্তুতি
নিউজিল্যান্ডের নাগরিক জন এডওয়ার্ড পাডনি জর্জিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় সরকারি বনভূমি ইজারা নিয়ে কাঠের বাড়ি বানানোর পেশায় যুক্ত ছিলেন। এছাড়া দেশটির কোস্ট গার্ডেও এক দশক কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। গর্জন কাঠের প্রতি আকর্ষণে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পরিবারটি বাংলাদেশে আসে। কক্সবাজারের এসএম পাড়ার স্থানীয় কারিগরদের সহায়তায় প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে দীর্ঘ দেড় বছর ধরে তৈরি করা হয় এই ক্যাটামারানটি। বাঁকখালী নদীতে বিআইডব্লিউটিএ ঘাটের কাছে নোঙর করে গত কয়েক মাস ধরে এটিই হয়ে উঠেছিল চার সদস্যের এই পরিবারের একমাত্র ঠিকানা।
আইনি জটিলতা ও নানা প্রতিকূলতা
যাত্রা শুরুর আগেই নানা সংকটে পড়ে পরিবারটি। ২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল সোনাদিয়া দ্বীপে নোঙর করার সময় একদল দুর্বৃত্তের হামলার শিকার হয় তারা। পরবর্তীতে ডিজেল সংকটের কারণে থাইল্যান্ডের পরিবর্তে নিউজিল্যান্ডে সরাসরি ফেরার পরিকল্পনা করা হয়। পাশাপাশি ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার জটিলতাও তৈরি হয়েছিল। সর্বশেষ ২৪ মে ভিসার মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর তা নবায়নের প্রস্তুতি চলছিল।
ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা ও বর্তমান পরিস্থিতি
বর্তমানে সম্পূর্ণ সহায়হীন হয়ে পড়েছে পাডনি পরিবার। কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের একটি হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং পুলিশি নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে। শ্রীলঙ্কায় অবস্থিত নিউজিল্যান্ড দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও এখনো কাঙ্ক্ষিত সহায়তা মেলেনি। ধ্বংসপ্রাপ্ত নৌকার অবশিষ্ট অংশ বিক্রি করে জরুরি খরচ মেটানোর চেষ্টা করছেন জন। প্রিয় সন্তান আলবার্টের শেষকৃত্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আপাতত বাংলাদেশেই থাকতে চান এই শোকস্তব্ধ পিতা।


