বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হত্যায় গ্রেপ্তার কে এই হিশাম আবুগারবিয়েহ?

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় (ইউএসএফ) অধ্যয়নরত দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার হিশাম আবুগারবিয়েহকে নিয়ে বেরিয়ে আসছে গা শিউরে ওঠা সব তথ্য।

 

২৬ বছর বয়সী এই মার্কিন নাগরিকের উগ্র মেজাজ ও অপরাধপ্রবণ অতীত বিশ্লেষণ করে পুলিশ বলছে, তিনি একজন ‘সিরিয়াল অফেন্ডার’ বা নিয়মিত অপরাধী। লিমনের সাবেক রুমমেট এই হিশামের বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিক সহিংস অপরাধ ও পারিবারিক নির্যাতনের অভিযোগ ছিল।

সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, হিশামের বাসা থেকেই নাহিদা বৃষ্টির মরদেহের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের মাধ্যমে তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বৃষ্টির পরিবার, যা এই হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতাকে আরও উসকে দিয়েছে।

ছবি: সংগৃহীত

তদন্ত কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, হিশামকে গ্রেপ্তার করার প্রক্রিয়াটি ছিল বেশ নাটকীয় ও উত্তেজনাকর। টাম্পার উত্তরে হিশামের নিজের বাড়িতে পারিবারিক সহিংসতার খবর পেয়ে পুলিশ উপস্থিত হলে তিনি নিজেকে ঘরের ভেতর অস্ত্রসহ অবরুদ্ধ করে ফেলেন। পরিস্থিতি এতটাই জটিল আকার ধারণ করে যে, শেষ পর্যন্ত পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট ‘সোয়াট’ (SWAT) টিম তলব করতে হয়।

দীর্ঘ সময় পুলিশকে লক্ষ্য করে প্রতিরোধ গড়ে তোলার পর একপর্যায়ে সোয়াট টিমের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন এই ঘাতক। মূলত তার পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তাকে বাড়ি থেকে বের করে আনতে পুলিশকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল।

হিলসবোরো কাউন্টি আদালত ও শেরিফ অফিসের রেকর্ড বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, হিশাম আবুগারবিয়েহ ইউএসএফেরই প্রাক্তন শিক্ষার্থী ছিলেন। ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে পড়াশোনা করলেও গ্রেপ্তারের সময় তার ছাত্রত্ব ছিল না। আদালতের নথি বলছে, ২০২৩ সালের মে ও সেপ্টেম্বর মাসেও তার বিরুদ্ধে শারীরিক আঘাত এবং চুরির মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছিল। সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, হিশামের নিজের পরিবারের সদস্যরাই তার সহিংস আচরণের অতিষ্ঠ হয়ে আদালতে ‘পারিবারিক সুরক্ষা নিষেধাজ্ঞা’র আবেদন করেছিলেন। অর্থাৎ নিজের ঘরেও তিনি একজন ভয়ঙ্কর মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

গ্রেপ্তারের পর হিশামের বিরুদ্ধে বর্তমানে একাধিক গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মৃত্যুর সংবাদ গোপন করা, অবৈধভাবে মৃতদেহ সরানো, আলামত নষ্ট করা এবং পরিকল্পিতভাবে শারীরিক আঘাত ও সহিংসতা। জামিল লিমনের খণ্ডিত মরদেহ সেতুর নিচ থেকে উদ্ধার এবং নাহিদা বৃষ্টির মৃত্যুর চূড়ান্ত নিশ্চিত হওয়ার পর এখন হিশামকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। লিমনের পিএইচডি গবেষণা এবং বৃষ্টির রাসায়নিক প্রকৌশলের উজ্জ্বল ক্যারিয়ার কেন এমন নৃশংসতায় থেমে গেল, তার নেপথ্যে হিশামের ব্যক্তিগত আক্রোশ না কি অন্য কোনো মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে, তা খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা।

নাহিদা বৃষ্টির ভাই জাহিদ হাসান প্রান্ত জানিয়েছেন, হিশামের বাসার ভেতরে রক্তের নমুনার সঙ্গেই তার বোনের ডিএনএ মিল খুঁজে পেয়েছে মার্কিন পুলিশ। বৃষ্টির মরদেহ পূর্ণাঙ্গ অবস্থায় পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে এখনও সংশয় থাকলেও এটি নিশ্চিত যে, হিশাম অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় এই জোড়া হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন।

বর্তমানে হিলসবোরো কাউন্টি হেফাজতে থাকা হিশামের বিরুদ্ধে হত্যা মামলার চার্জশিট তৈরির কাজ চলছে। ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন এবং হিশামের অপরাধমূলক অতীতের সব নথি একত্রিত করে মার্কিন প্রশাসন এই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হত্যার সর্বোচ্চ সাজার লক্ষ্যে কাজ করছে।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 4   +   8   =