বিনোদন ডেস্ক, দৈনিক পূর্বাচল:
ঢাকাই চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি প্রযোজক ও পরিচালক শফি বিক্রমপুরী। ‘অরুনোদয়ের অগ্নিস্বাক্ষী’ থেকে ‘ডাকু মনসুর’—তাঁর প্রযোজিত সব কালজয়ী সিনেমার তালিকাসহ বিস্তারিত পড়ুন দৈনিক পূর্বাচলে।
চলতি আষাঢ়ের এই মেঘ-বৃষ্টির দিনে ঢাকাই চলচ্চিত্রের সোনালী ইতিহাসের পাতা ওল্টালে যার নাম সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে ভেসে ওঠে, তিনি শফি বিক্রমপুরী। আজ ৪ঠা জুলাই, রূপালী পর্দার এই অবিসংবাদিত অভিভাবক ও কালজয়ী চলচ্চিত্রকারের ৮৩তম জন্মদিন। ১৯৪৩ সালের এই দিনে মুন্সীগঞ্জের মত্তগ্রামে জন্মগ্রহণ করা শফি বিক্রমপুরী ষাট থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত একাধারে প্রযোজক, পরিচালক ও পরিবেশক হিসেবে ইন্ডাস্ট্রিকে শাসন করেছেন। ২০০০ সালে পবিত্র হজ পালনের পর নিজেকে সিনেমা থেকে গুটিয়ে নিলেও বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তিনি এক অনন্য পথপ্রদর্শক।
হলিউড থেকে কাকরাইলের রাজত্ব
১৯৪৮ সাল থেকে দীর্ঘ সাত দশক ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করা শফি বিক্রমপুরী পড়াশোনা করেছেন পুরান ঢাকার মুসলিম হাইস্কুল ও সোহরাওয়ার্দী কলেজে। বাণিজ্য বিভাগ থেকে বি.কম পাস করা এই গুণী ব্যক্তিত্বের সিনেমা যাত্রা শুরু হয়েছিল চমকপ্রদভাবে। ১৯৬৪ সালে হলিউডের বিশ্বখ্যাত ইংরেজি ছবি ‘এঞ্জেলিক’ এবং ‘ফান্টুমাস’ পরিবেশনার মাধ্যমে এই লাইনে তাঁর প্রবেশ। ঠিক তার পরের বছরই, ১৯৬৫ সালে লোকজ গল্পের কালজয়ী সিনেমা ‘গুনাইবিবি’র নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে ঢালিউডে তাঁর রাজকীয় অভিষেক ঘটে। এরপর নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে তিনি নির্মাণ করেন ‘পাতালপুরীর রাজকন্যা’ (১৯৬৯), ‘মায়া ডোরে বাঁধা’ (১৯৭০) এবং ‘দুরন্ত পথিক’ (১৯৭০, অসমাপ্ত)।
‘যমুনা ফিল্মস’ ও কালজয়ী সিনেমার ইতিহাস
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ঐতিহ্যবাহী প্রযোজনা সংস্থা ‘যমুনা ফিল্ম কর্পোরেশন লিঃ’। এই ব্যানারের অধীনে তিনি একের পর এক কালজয়ী ও বাণিজ্যিকভাবে সফল ছবি উপহার দিয়েছেন। তাঁর প্রযোজিত ও পরিবেশিত ছবিগুলোর সম্পূর্ণ তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
-
অরুনোদয়ের অগ্নিস্বাক্ষী (মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কালজয়ী ছবি) — ০৮/১১/১৯৭২
-
জীবন তৃষ্ণা — ১৬/০১/১৯৭৩
-
ডাকু মনসুর — ২৬/০৭/১৯৭৪
-
বাহাদুর — ২৬/০৯/১৯৭৬
-
মহেশখালীর বাঁকে — ১২/১১/১৯৭৮
-
বন্দুক — ২৯/০৬/১৯৭৯
-
কলমীলতা (মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি) — ২৫/১২/১৯৮১
-
সবুজ সাথী — ১৩/০auto৮/১৯৮২
-
মহল — ১২/১০/১৯৮৪
-
সকাল সন্ধ্যা — ০৯/১১/১৯৮৪
-
মাটির কোলে — ০৩/০৫/১৯৮৬
-
তুফান মেইল — ২৫/০৭/১৯৮৬
-
শশী পুন্নু — ০৩/০৭/১৯৮৭
-
লেডিকমান্ডো — ২৭/১২/১৯৯১
-
শান্তি অশান্তি — ২৫/১২/১৯ Taz৯২
-
জজ সাহেব — ০৯/০২/১৯৯৭
প্রযোজনার পাশাপাশি একজন সফল পরিচালক হিসেবেও তিনি ঢালিউডকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর পরিচালিত সুপারহিট সিনেমাগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘রাজ দুলারী’ (২০/০১/১৯৭৮), ‘আলাদিন আলী বাবা সিন্দাবাদ’ (০৮/০৫/১৯৮১), ‘লেডি ইন্সপেক্টর’ (০৯/০৪/১৯৯৩), ‘দেনমোহর’ (০৩/০৩/১৯৯৫) এবং ‘অবুঝ মনের ভালবাসা’ (২৯/০৩/১৯৯৯)। এছাড়া ১৯৮৯ সালে ঢাকার মালিবাগে ‘পদ্মা’ ও ‘সুরমা’ নামে দুটি আধুনিক সিনেমা হলও নির্মাণ করেন তিনি।
ইন্ডাস্ট্রির সংকট মোচনে ‘নতুন মুখের সন্ধানে’
আশির দশকের শুরুতে যখন ঢাকাই সিনেমায় তীব্র শিল্পী সংকট দেখা দেয়, তখন ত্রাতা হিসেবে এগিয়ে আসেন শফি বিক্রমপুরী। ১৯৮৪ সালে এফডিসি আয়োজিত ঐতিহাসিক ‘নতুন মুখের সন্ধান’ কার্যক্রমের অন্যতম মূল রূপকার ছিলেন তিনি। সুভাষ দত্ত, আমজাদ হোসেনদের সঙ্গে মিলে হাজারো প্রতিভার মধ্য থেকে তিনি ছেঁকে বের করেছিলেন ঢালিউডের ভবিষ্যৎ মেগাস্টার মান্না, অমিত হাসান, সোহেল চৌধুরী, দিতি কিংবা খালেদা আকতার কল্পনার মতো কিংবদন্তিদের।
তারকাদের পরম আশ্রয় ও শফি বিক্রমপুরী ভবন
সিনেমাপাড়ায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন ও আস্থার প্রতীক। শাবানা, ববিতা, সুচন্দা, সুজাতা থেকে শুরু করে সাবিনা ইয়াসমিন কিংবা অ্যাকশন কিং জসিম—ব্যক্তিগত বা পেশাদার যেকোনো বিষয়ে শফি বিক্রমপুরীর শলা-পরামর্শ নিতেন না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার ছিল। কাকরাইলে তাঁর তৈরি ‘শফি বিক্রমপুরী ভবন’ (যা বর্তমানে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়) একসময় ছিল সিনেমার মানুষের প্রধান আড্ডাস্থল। নায়ক ফারুক, উজ্জ্বল, বুলবুল আহমেদ থেকে শুরু করে মৌসুমীদের বহু স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই ভবনে। চলচ্চিত্রের প্রথম ২৫ বছরের জীবিত কুশলীদের নিয়ে তাঁর গড়া ‘বাংলাদেশ সিনে স্টার ফোরাম’-এর প্রথম আজীবন সদস্যপদ গ্রহণ করেছিলেন খোদ নায়করাজ রাজ্জাক।

