জুলাই বিপ্লবে শহীদ সাংবাদিকেরা: বিচারের ধীরগতি আর স্বজনদের অন্তহীন হাহাকার

বিশেষ প্রতিবেদন ও সম্পাদকীয়:

সোহেল হাওলাদার, নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক পূর্বাচল

প্রকাশের তারিখ: বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬

সময়: দুপুর ০১:৪০ (ঢাকা)

জুলাই বিপ্লব কাভার করতে গিয়ে শাহাদাত বরণকারী এটিএম তুরাব, তাহির জামান প্রিয়সহ ৬ সাংবাদিকের খুনিদের দ্রুত বিচারের দাবিতে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান।

ঢাকা:

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আর সত্য প্রকাশের অদম্য স্পৃহা নিয়ে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক জুলাই বিপ্লব কাভার করতে গিয়েছিলেন তাঁরা। স্বৈরাচারী বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আর ফেরা হয়নি এই সাহসী সাংবাদিকদের। তাঁরা আজ আমাদের মাঝে নেই, তাঁরা দেশের জন্য, সত্যের জন্য শাহাদাত বরণ করেছেন। সময় বহমান; অনেকেই হয়তো সুদিনের আলোয় তাঁদের আত্মত্যাগের কথা ভুলতে বসেছেন, বাকিরাও হয়তো সময়ের নিয়মে একদিন ভুলে যাবেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—তাঁদের স্বজনরা কি কোনোদিন ভুলতে পারবেন?

এই শহীদ সাংবাদিকদের অনেকেরই কোলের সন্তান আজ ‘বাবা’ ডাকা শেখার আগেই এতিম হয়ে গেছে। পিতৃত্বের এই চিরন্তন অভাব কোনো জাগতিক প্রাপ্তি কিংবা অনুদান দিয়ে কি কখনো পূরণ করা সম্ভব? কখনোই নয়। দুনিয়াবি সকল অভাব মিটে গেলেও বাবার শূন্যতা কোনোদিন কোনো কিছুর বিনিময়ে পূরণ হবে না। তবে যা সম্ভব, তা হলো এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার করা। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, বিপ্লবের দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও খুনিদের দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের দৃশ্যমান ও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ এখনো সাধারণ মানুষের চোখে পড়েনি। শহীদদের রক্তাক্ত স্বজনদের সাথে আজ গোটা দেশবাসীর একটাই জোরালো দাবি—খুনিদের দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা।

জুলাই বিপ্লবে আত্মোৎসর্গকারী ৬ গণমাধ্যম যোদ্ধা

পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে বুলেটের আঘাতে ও নৃশংসতায় শহীদ হওয়া এই ৬ নির্ভীক সাংবাদিকের আত্মত্যাগ ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে:

১. শহীদ এটিএম তুরাব (১৯ জুলাই, সিলেট):

সিলেটে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় ১৯ জুলাই পুলিশের গুলিতে নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করেন সাংবাদিক এটিএম তুরাব। মাঠপর্যায়ে সত্য তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বুলেটের শিকার হন।

২. শহীদ তাহির জামান প্রিয় (১৯ জুলাই, সাইন্সল্যাব, ঢাকা):

রাজধানীর সায়েন্সল্যাব এলাকায় ১৯ জুলাই ছাত্র-জনতার আন্দোলন কাভার করতে গিয়ে গুলিতে নিহত হন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও আলোকচিত্রী তাহির জামান প্রিয়।

৩. শহীদ হাসান মেহেদী (১৮ জুলাই, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা):

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যাত্রাবাড়ী পয়েন্টে ১৮ জুলাই রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়া আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে বুলেটের আঘাতে শহীদ হন সাংবাদিক হাসান মেহেদী।

৪. শহীদ সাকিল হোসাইন (১৮ জুলাই, উত্তরা, ঢাকা):

১৮ জুলাই উত্তরার উত্তাল রাজপথে সংবাদ সংগ্রহের সময় সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে শাহাদাত বরণ করেন গণমাধ্যমকর্মী সাকিল হোসাইন।

৫. শহীদ প্রবীর কুমার ভৌমিক (৪ আগস্ট, সিরাজগঞ্জ):

বিপ্লবের শেষলগ্নে ৪ আগস্ট সিরাজগঞ্জে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে চরম নৃশংসতার শিকার হয়ে শহীদ হন সাংবাদিক প্রবীর কুমার ভৌমিক।

৬. শহীদ সোহেল আখুঞ্জী (৫ আগস্ট, হবিগঞ্জ):

৫ আগস্ট স্বৈরাচারের পতনের চূড়ান্ত দিনে হবিগঞ্জে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় হামলা ও সংঘর্ষের মুখে পড়ে শাহাদাত বরণ করেন সাংবাদিক সোহেল আখুঞ্জী।

দৃশ্যমান বিচার অধরা, সোচ্চার হওয়ার আহ্বান

এই বীর সাংবাদিকেরা কোনো দলের হয়ে লড়েননি, তাঁরা লড়েছেন তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে এবং ফ্যাসিবাদের আসল চেহারা উন্মোচন করতে। অথচ আজ পর্যন্ত এই খুনিদের চিহ্নিত করে ট্রাইব্যুনালে দ্রুত শাস্তির মুখোমুখি করার প্রক্রিয়াটি মন্থর গতিতে চলছে। স্বজনদের চোখ থেকে এখনো অশ্রু ঝরছে, এতিম সন্তানদের শূন্যতা আমাদের বিচারব্যবস্থাকে প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

‘দৈনিক পূর্বাচল’-এর পক্ষ থেকে আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই—শহীদ সাংবাদিকদের রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া যাবে না। অনতিবিলম্বে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই ৬ সাংবাদিকসহ জুলাই বিপ্লবের সকল হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন করতে হবে। একই সাথে, দেশের সকল স্তরের জনগণকে এই ন্যায়সঙ্গত দাবিতে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সোচ্চার হওয়ার জন্য বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 5   +   4   =