‘রূপনগর’-এ ডুবে আছি আজও
‘ছি…ছি…ছি… তুমি এত খারাপ?’ একটা সংলাপ—শুধু কয়েকটা শব্দ। অথচ একসময় এই কয়েকটা শব্দ শোনার জন্য মানুষ ভিড় জমাতো বাজারে, দোকানে, রাস্তার মোড়ে। টেলিভিশন তখন সবার ঘরে ঘরে ছিল না, বিদ্যুৎও ছিল অনিয়মিত। কোথাও একটা টিভি আছে—এই খবরই ছিল যথেষ্ট। ব্যাটারি চালিত সেই টিভির সামনে সন্ধ্যা নামলেই জমে উঠত মানুষের আসর।
সেই সময়টা ছিল অন্যরকম। বিজ্ঞাপনও মানুষ মন দিয়ে দেখত, মুখস্থ করে ফেলত। আর নাটক শুরু হলে—চারপাশ যেন থমকে যেত। ছোটবেলার সেই দিনগুলোতে নিজের ঘরে টিভি না থাকায়, ভাইয়ের হাত ধরে বাজারে গিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নাটক দেখার অভ্যাস ছিল অনেকেরই। শুধু নিজের গল্প নয়, এ ছিল পুরো একটা প্রজন্মের অভিজ্ঞতা।
সেই ভিড়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল একটাই নাম—রূপনগর।
নাটক শুরু হলেই বাজার ভরে যেত মানুষে। কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বসে, কেউ আবার কাঁধের ওপর দিয়ে উঁকি মেরে—সবাই শুধু দেখতে চাইত ‘রূপনগর’। এমনও হয়েছে, পাশে দাঁড়ানো কেউ হঠাৎ বলে উঠেছে — ‘হেলালল্যা কই? হেলালল্যারে না দেখালে ভাল্লাগে না!’
একজন ভিলেন চরিত্রের জন্য এমন অপেক্ষা—এদেশের নাটকের ইতিহাসে খুব বেশি দেখা যায়নি। ‘হেলাল’ নামের সেই চরিত্র যেন ভয় আর ভালোবাসা—দুটোই একসাথে হয়ে উঠেছিল। আর এই চরিত্রটাকে জীবন্ত করে তুলেছিলেন প্রয়াত অভিনেতা খালেদ খান।
সত্যি বলতে, ভিলেনকে ভালোবাসার শুরুটা অনেকের কাছে এখান থেকেই। তার হাঁটা, চাহনি, সংলাপ বলার ভঙ্গি—সবকিছুতেই ছিল এক অদ্ভুত টান। মনে হতো, সে যেন কোথাও লুকিয়ে থাকা শিকারকেও গন্ধ পেয়ে খুঁজে বের করতে পারে।
নাটকের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ছিল আরেকটা বড় শক্তি। সেই ভয় ধরানো সুর বাজলেই সবাই চুপ হয়ে যেত—এই বুঝি হেলাল আসছে! আর ঠিক তখনই, সেই সুর কেটে যখন তিনি প্রবেশ করতেন, আর বলতেন— ‘ছি…ছি…ছি… তুমি এত খারাপ?’ —দর্শক সত্যিই গুটিয়ে বসে পড়ত।
এই নাটকের পেছনে ছিলেন ইমদাদুল হক মিলন। তাঁর লেখায় তৈরি ‘রূপনগর’ হয়ে উঠেছিল টেলিভিশন নাটকের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক। এখানে শুধু গল্প ছিল না, ছিল চরিত্রের গভীরতা, আবেগ, ভয়—সবকিছুর মিশেল।
নায়ক হিসেবে ছিলেন তৌকীর আহমেদ, নায়িকা বিপাশা হায়াত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—এই নাটকের আলো অনেকটাই কেড়ে নিয়েছিল এক ভিলেন চরিত্র। খালেদ খান যেন নতুন করে জন্ম নিয়েছিলেন দর্শকের মনে।
তখনকার সময়টা ছিল বিটিভির স্বর্ণযুগ। সন্ধ্যার আগেই সবাই কাজ সেরে বসে পড়ত টিভির সামনে। একের পর এক নাটক মানুষের জীবনকে নাড়িয়ে দিত।
মনে পড়ে এইসব দিনরাত্রি—যেখানে বুলবুল আহমেদ, আসাদুজ্জামান নূর আর ডলি জহুর হয়ে উঠেছিলেন ঘরের মানুষ। ছোট্ট টুনির মৃত্যুতে মানুষ এতটাই কেঁদেছিল যে পরদিন প্রেসক্লাবের সামনে ব্যানার টানানো হয়েছিল— ‘টুনির কেন মৃত্যু হলো, হুমায়ূন আহমেদ জবাব চাই!’
আবার কোথাও কেউ নেই-এর ‘বাকের ভাই’—যার ফাঁসির বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে এসেছিল মানুষ। ‘বাকের ভাইয়ের ফাঁসি হলে জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে’—এই স্লোগান তখন শুধু সংলাপ ছিল না, হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের ভাষা।
এইসব গল্প প্রমাণ করে—নাটক তখন শুধু বিনোদন ছিল না, ছিল মানুষের জীবনের অংশ।
আজ এত বছর পর দাঁড়িয়ে মনে হয়—সেই চরিত্রগুলো কোথায় হারিয়ে গেল? এখনো কি এমন কোনো ‘হেলাল’ তৈরি হয়, যাকে মানুষ ঘৃণা করেও ভালোবাসবে? এখনো কি এমন কোনো সংলাপ আছে, যা শোনার জন্য মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকবে?
সময় বদলেছে, মাধ্যম বদলেছে। কিন্তু সেই আবেগ, সেই অপেক্ষা—সেগুলো যেন কোথাও হারিয়ে গেছে। তবু মাঝে মাঝে হঠাৎ মনে পড়ে যায়—একটা বাজার, একটা ভিড়, আর দূর থেকে ভেসে আসা সেই সংলাপ— ‘ছি…ছি…ছি… তুমি এত খারাপ?’


