কুমিল্লায় কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী হত্যাকাণ্ড কেউ মেনে নিতে পারছেন না। পৈশাচিক এই ঘটনা স্বজনদের পাশাপাশি নগরীর সবস্তরের মানুষের হৃদয়ে নাড়া দিয়েছে। সবার মুখে একই প্রশ্ন-কী কারণে তাকে হত্যা করা হলো? ঘটনার পর বুলেটের স্ত্রী উর্মি হীরা পাগলপ্রায়। হাউমাউ করে শুধু কান্না করছেন। তার একটাই প্রশ্ন-‘আমার স্বামীকে কেন হত্যা করা হলো? তার তো কোনো শত্রু ছিল না।’ রোববার দুপুরে লাশ বিদায়ের সময় সহকর্মীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরিবারের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন তারা। কুমিল্লা নগরীর রাজগঞ্জ পানপট্টি এলাকার একটি ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকতেন কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী (৩৫) ও তার পরিবারের সদস্যরা।
রোববার সকালে রাজগঞ্জের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, বুলেটের পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে ছুটে এসেছেন স্বজনরা। স্ত্রী উর্মি হীরার চোখে শুধুই অশ্রু ঝরছে। শুধু স্বজনদের দিকে নির্বাক তাকিয়ে থাকছেন তিনি। আর একটু পর পর হাউমাউ করে কান্না করছেন। তার প্রশ্ন-আমার স্বামীকে কেন হত্যা করা হলো? সে তো কারো সঙ্গে কখনো খারাপ ব্যবহার করেনি। তার তো কোনো শত্রু ছিল না। তিনি অত্যন্ত শান্ত প্রকৃতির একটা মানুষ ছিলেন। আমাকে কেন অল্প বয়সে বিধবা করা হলো? সেদিন আমার স্বামীর সঙ্গে কী ঘটেছিল আমি একবার জানতে চাই। ঘাতকরা কেন আমার স্বামীকে হত্যা করেছে আমি জানতে চাই। কেন তার প্রতি এত নির্দয় হলো সেটাও জানতে চাই। কোনো কারণ ছাড়াই এভাবে একজন মানুষকে হত্যা করতে পারে আমার জানা ছিল না। হীরার কান্নার এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখে আশপাশের লোকজনও কান্নায় ভেঙে পড়েন। এদিকে ছেলের জন্য একটু পরপরই কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন মা নীলিমা বৈরাগী। তিনি বলেন, ‘বুলেট আমার সোনার ছেলে। আমার সোনার ছেলেটার দেহ কীভাবে আগুনে দাহ হবে।’
চট্টগ্রাম থেকে গত শুক্রবার রাতে কুমিল্লার বাসায় ফিরছিলেন বুলেট বৈরাগী (৩৫)। কাছাকাছি স্থানে পৌঁছে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একাধিকবার কথাও বলেছিলেন। কিন্তু তার আর বাসায় ফেরা হয়নি। শনিবার সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার কোটবাড়ী এলাকার আইরিশ হিল হোটেলের পাশে মিলেছে ওই কাস্টমস কর্মকর্তার লাশ। শরীরে ও মুখমণ্ডলে রক্তাক্ত চিহ্ন ছিল।
পরিবারের সদস্যদের ধারণা, বুলেট হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এ ঘটনায় শনিবার রাতে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় মামলা করেছেন মা নীলিমা বৈরাগী। মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। রোববার দুপুর পর্যন্ত হত্যার কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ।
বুলেট বৈরাগী গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া গ্রামের বাবুপাড়া এলাকার বাসিন্দা সুশীল বৈরাগীর ছেলে। তিনি ৪১তম বিসিএস নন-ক্যাডার পদে কাস্টমস, এক্সসাইজ ও ভ্যাট বিভাগে যোগদান করেন। এরপর সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসাবে কর্মরত ছিলেন কুমিল্লার বিবিরবাজার স্থলবন্দরে। সেখান থেকেই ১ এপ্রিল চট্টগ্রামে যান ৪৪তম বনিয়াদি প্রশিক্ষণে। চাকরির সুবাদে তিনি কুমিল্লা নগরীর রাজগঞ্জ পানপট্টি এলাকার ওই ভাড়া বাসায় থাকতেন। বুলেট মা-বাবার একমাত্র সন্তান ছিলেন।
বুলেটের মা নীলিমা বৈরাগী বলেন, ‘আমার স্বামী কৃষক ছিলেন। অনেক কষ্টে ছেলেটাকে বড় করেছি। ভালো মানুষ বানিয়েছি। শুক্রবার দিবাগত রাত ২টা ১০ মিনিটের দিকে কথা হয় বুলেটের সঙ্গে। তখন বলল, বাসে আছে, কিছুক্ষণের মধ্যে বাসায় ফিরব।’ এর কিছুক্ষণ পর কল দিলে আর রিসিভ হয়নি। এরই মধ্যে আমরা অস্থির হয়ে পড়ি। একের পর কল দিতে থাকি। সর্বশেষ ভোর পৌনে ৪টার দিকে কলটি রিসিভ করে অপর প্রান্ত থেকে বলে, ‘ঘুমাইতেছি, আরেকটু পরে আইতেছি।’ তখনই বুঝেছি, আমার ছেলের সঙ্গে খারাপ কিছু হয়েছে। কারণ, এটা আমার ছেলের ভাষা না। ওই সময়ই মনে হচ্ছিল ২টা ১০ মিনিটে তাহলে কি অন্য কারো সঙ্গে কথা বলেছি? অনেক খোঁজাখুঁজির পর জানতে পারি আমার সোনা ছেলেটার লাশ রাস্তার পাশে পাওয়া গেছে।’
উর্মি হীরা জানান, তার স্বামীর (বুলেট বৈরাগী) চট্টগ্রামে বনিয়াদি প্রশিক্ষণ চলছিল। প্রতি সপ্তাহে প্রশিক্ষণ শেষ করে বৃহস্পতিবার রাতে কুমিল্লায় চলে আসতেন। শুক্রবার তিনি রাঙামাটির কাপ্তাই ঘুরতে গিয়েছিলেন। সেখানে থেকে ফিরে রাত ১১টার দিকে চট্টগ্রামের অলঙ্কার মোড় থেকে একটি বাসে উঠেছিলেন। লাশ উদ্ধারের সময় তার মুঠোফোনটি পাওয়া যায়নি।
সন্তানের জন্মদিন পালন করা হলো না : ২০২২ সালের ২২ এপ্রিল উর্মি হীরা ও বুলেট বৈরাগীর বিয়ে হয়। গত বুধবার ছিল এই দম্পতির বিবাহবার্ষিকী। তবে চট্টগ্রামে প্রশিক্ষণে থাকায় বুলেট কুমিল্লায় পরিবারের কাছে আসতে পারেননি। তাদের ছেলে অব্যয় বৈরাগীর জন্ম হয়েছে কুমিল্লা নগরীর ভাড়া বাসায়। ২৭ এপ্রিল তার বয়স এক বছর পূর্ণ হবে। মূলত সন্তানের জন্মদিন ও বিবাহবার্ষিকী ঘিরেই শুক্রবার রাত ১১টায় চট্টগ্রাম থেকে রওয়ানা দেন বুলেট। উর্মি হীরা জানান, সন্তানের জন্মদিন পালন করে রোববার ভোরেই বুলেট চট্টগ্রামে ফিরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বুলেটের সেই ইচ্ছে আর পূরণ হলো না। গত বুধবার বিবাহবার্ষিকীতে উর্মি হীরা ফেসবুকে তাদের নানা মুহূর্তের ছবি পোস্ট করেন।
সহকর্মীদের শেষ শ্রদ্ধা : কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে রোববার বেলা ১১টার দিকে বুলেটের লাশ নেওয়া হয় নগর উদ্যানের পাশে অবস্থিত কাস্টমস, এক্সসাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট কুমিল্লা কার্যালয়ে। এ সময় সহকর্মীরা কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধ জানান। পরে কাস্টমস, এক্সসাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট কুমিল্লা কার্যালয়ের কমিশনার আবদুল মান্নান সরদার তার কার্যালয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন। একপর্যায়ে বুলেটের লাশবাহী গাড়ির সামনে বিলাপ আর কান্নায় ভেঙে পড়েন স্ত্রী, বাবা, মাসহ স্বজনরা। পরে লাশ শেষকৃত্যের জন্য নিয়ে যাওয়া হয় গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়।
এ বিষয়ে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার ওসি সিরাজুল মোস্তফা বলেন, ‘এটি একটি হত্যাকাণ্ড। আমরা হত্যাকাণ্ডে মোটিভ উদ্ঘাটনে কাজ করছি। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। এরই মধ্যে পুলিশের একাধিক টিম রহস্য উদ্ঘাটনে কাজ শুরু করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যান্য ইউনিটও কাজ করছে। আশা করছি আমাদের তদন্তে সব বেরিয়ে আসবে।’
নিজ বাড়ির আঙিনায় সমাহিত : গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, বুলেট বৈরাগীকে টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া ইউনিয়নের বাবুপাড়া গ্রামের নিজ বাড়ির আঙিনায় ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী সমাহিত করা হয়েছে। রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে লাশ সমাহিত করা হয়। এর আগে লাশবাহী গাড়ি কুমিল্লা থেকে গ্রামের বাড়িতে পৌঁছলে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। কান্নায় ভেঙে পড়েন বাড়ির লোকজন ও পাড়া-প্রতিবেশী।


