ইসলাম ডেস্ক, দৈনিক পূর্বাচল:
১৬ মহররম ১৪৪৮ হিজরি | ১৫ জুন ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
পবিত্র কাবা শরিফের কালো আবরণ বা কিসওয়াহ তৈরির ৭টি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ এবং ব্যবহৃত মূল্যবান উপাদান নিয়ে বিস্তারিত জানুন দৈনিক পূর্বাচলে।
পবিত্র কাবা শরিফের গায়ে ব্যবহৃত কালো আবরণ, যা ‘কিসওয়াহ’ বা কাবার গিলাফ নামে পরিচিত, অত্যন্ত যত্ন ও নিখুঁত কারুকাজের মাধ্যমে তৈরি করা হয়। খাঁটি রেশম, রুপা ও সোনার প্রলেপযুক্ত সুতা ব্যবহার করে তৈরি এই কিসওয়াহ প্রস্তুতের পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত নিখুঁত এবং কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রতি বছর ইসলামি নববর্ষের প্রথম মাস মহররমের প্রথম দিনে পবিত্র কাবা শরিফে এই নতুন কিসওয়াহ পরানো হয়। শতাব্দীপ্রাচীন এই ঐতিহ্য আজও সৌদি আরবে অত্যন্ত গুরুত্ব ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে পালন করা হয়।
কিসওয়াহ তৈরির ৭টি প্রধান ধাপ
একটি কিসওয়াহ বা গিলাফ তৈরিতে আধুনিক প্রযুক্তি ও ঐতিহ্যবাহী হাতের কাজের অনন্য সমন্বয় ঘটানো হয়। এর মূল ধাপগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. পানি প্রস্তুত ও লবণমুক্তকরণ
কিসওয়াহ তৈরির প্রথম ধাপে কাঁচা রেশম ধোয়া ও রং করার জন্য বিশেষভাবে পরিশোধিত এবং সম্পূর্ণ লবণমুক্ত পানি প্রস্তুত করা হয়। পানির মান নিখুঁত না হলে রেশমের উজ্জ্বলতা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
২. রেশম ধোয়া ও রং করা
এ ধাপে রেশম থেকে প্রাকৃতিক মোম অপসারণ করা হয়। এরপর তা নির্দিষ্ট রঙে রঞ্জিত করা হয়। কাবার বাইরের আবরণের জন্য প্রথাগত কালো রঙ এবং কাবার ভেতরের অংশ ও বিশেষ স্থানের জন্য দৃষ্টিনন্দন সবুজ রং ব্যবহার করা হয়।
৩. যান্ত্রিক বয়ন
রঞ্জিত রেশমের সুতাগুলো অত্যাধুনিক আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে বোনা হয়। নিখুঁত বয়নের মাধ্যমে সুতাগুলোকে কিসওয়াহ তৈরির উপযোগী বিশেষ ভারী কাপড়ে রূপান্তর করা হয়।
৪. নকশা ও লেখার মুদ্রণ
পবিত্র কুরআনের আয়াত ও বিভিন্ন অলংকরণমূলক ক্যালিগ্রাফি নকশা কাপড়ের ওপর নিখুঁতভাবে স্থানান্তরের জন্য বিশেষ সিল্ক-স্ক্রিন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
৫. কাপড় সংযোজন ও সেলাই
বোনা কাপড়ের বিভিন্ন অংশ একত্র করে কিসওয়াহর মূল কাঠামো প্রস্তুত করা হয় এবং এর পর সোনা-রুপার সূচিকর্মের (এমব্রয়ডারি) জন্য নির্দিষ্ট স্থানগুলো নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করা হয়।
৬. স্বর্ণ ও রুপার সূচিকর্ম
এটি কিসওয়াহ তৈরির সবচেয়ে আকর্ষণীয় ধাপ। খাঁটি রুপার সুতা এবং সোনার প্রলেপযুক্ত রুপার তার দিয়ে কুরআনের আয়াত ও নকশাগুলো ফুটিয়ে তোলা হয়। ক্যালিগ্রাফিগুলোকে আকর্ষণীয় করতে এর নিচে তুলার বিশেষ প্যাডিং ব্যবহার করা হয়, যা লেখাগুলোকে উঁচু ও ত্রিমাত্রিক (3D) রূপ দেয়।
৭. গুণগত মান যাচাই
চূড়ান্তভাবে প্রস্তুত হওয়ার পর কিসওয়াহর প্রতিটি অংশ কঠোর মানদণ্ডে পরীক্ষা করা হয়। উপকরণ, সেলাই ও কারুকাজের সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত হওয়ার পরই এটি কাবা শরিফে দেওয়ার উপযোগী বলে গণ্য হয়।
কিসওয়াহ তৈরিতে ব্যবহৃত মূল্যবান উপকরণ
পবিত্র কাবার গিলাফ তৈরিতে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি ও উন্নতমানের উপকরণ ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে:
-
খাঁটি রেশম (সিল্ক): যা গিলাফের মূল কাপড় হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
-
সোনার প্রলেপযুক্ত তার ও রুপার সুতা: ক্যালিগ্রাফি ও চারপাশের বর্ডার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
-
তুলা: সূচিকর্মের নকশাকে ত্রিমাত্রিক রূপ দিতে ভেতরের প্যাডিং হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
কাবার এই গিলাফ বা কিসওয়াহ কেবল একটি আবরণ নয়, এটি মুসলিম উম্মাহর আবেগ, ঐতিহ্য এবং ইসলামি সংস্কৃতির এক অনন্য ও গৌরবময় নিদর্শন।
-
পবিত্র কাবা,কাবার গিলাফ,কিসওয়াহ,,Dainik Purbachal

