ফিচার ডেস্ক:
অনলাইনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ক্রল করতে করতে কোনো পোশাক বা গ্যাজেট পছন্দ হলো। অবধারিতভাবেই খোঁজা শুরু করলেন দাম কত। কিন্তু ক্যাপশনে দামের জায়গায় লেখা—‘দাম জানতে ইনবক্সে আসুন’ কিংবা ‘Price in Inbox’। বর্তমান সময়ে ই-কমার্সের যুগে এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। শুধু ছোটখাটো পেজই নয়, স্বনামধন্য অনেক বড় প্রতিষ্ঠানও এই কাজটি করে থাকে। আপাতদৃষ্টিতে বিষয়টি সাধারণ ক্রেতাদের জন্য চরম বিরক্তিকর মনে হলেও, এর পেছনে বিক্রেতাদের সুনির্দিষ্ট কিছু মনস্তাত্ত্বিক, বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিগত বিপণন কৌশল রয়েছে।
কেন এই লুকোচুরি? বিক্রেতাদের ভেতরের কৌশল
দাম লুকিয়ে ক্রেতাকে ইনবক্সে টেনে নেওয়ার পেছনে মূল কারণগুলো মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে:
১. ফেসবুক অ্যালগরিদমকে প্রভাবিত করা
সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট প্ল্যাটফর্ম ‘হুটসুইট’-এর একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম কোনো পোস্টের রিচ (Reach) বা প্রচার বাড়ায় তার ‘এনগেজমেন্ট’-এর ওপর ভিত্তি করে। পোস্টে দাম লেখা না থাকলে আগ্রহী ক্রেতারা বাধ্য হয়ে কমেন্টে লেখেন—‘দাম কত?’ বা ‘Price please’। বিক্রেতাও জবাবে লেখেন—‘প্লিজ চেক ইনবক্স’। এই প্রতিটি কমেন্ট ও রিপ্লাই ফেসবুকের অ্যালগরিদমকে সিগন্যাল দেয় যে পোস্টটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। ফলে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আরও হাজার হাজার মানুষের নিউজ ফিডে পৌঁছে যায় সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।
২. মানসিক বিনিয়োগ ও সরাসরি সম্পর্ক
‘থিংক মার্কেটিং’ ও ‘কোড-নাইনটিফাইভ’-এর গবেষণা বলছে, ইনবক্সে কথা বলার মাধ্যমে বিক্রেতারা ক্রেতার সাথে একটি ‘ওয়ান-টু-ওয়ান’ বা ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি করতে পারেন। একজন ক্রেতা যখন কষ্ট করে ইনবক্সে মেসেজ পাঠান, তখন অবচেতনভাবেই পণ্যের প্রতি তার এক ধরনের মানসিক টান বা বিনিয়োগ তৈরি হয়। এই সুযোগে দক্ষ চ্যাট অপারেটররা বিভিন্ন অফার বা বুঝিয়ে ক্রেতাকে পণ্যটি কিনতে রাজি করিয়ে ফেলেন।
৩. প্রতিযোগীদের থেকে মূল্য গোপন রাখা
‘ম্যাশআপ মার্কেটিং’-এর একটি কেস স্টাডি থেকে জানা যায়, প্রকাশ্যে দাম দেওয়া থাকলে প্রতিদ্বন্দ্বী পেজগুলো সহজেই তা দেখে ফেলে। অনেক সময় তারা ক্রেতা আকর্ষণের জন্য নিজেদের পেজে একই পণ্যের দাম কিছুটা কমিয়ে দেয়, যাকে বাজার ব্যবস্থাপনার ভাষায় ‘প্রাইস আন্ডারকাটিং’ বলা হয়। ইনবক্সে দাম জানালে প্রতিযোগীরা সহজে দাম জানতে পারে না।
গবেষণার ভিন্ন কথা: এটি আসলে ব্যবসার ক্ষতি করছে?
বিক্রেতারা একে দারুণ চতুর কৌশল ভাবলেও বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও বাজার বিশ্লেষণ কিন্তু উল্টো কথা বলছে। কম্বোডিয়ার ক্যামএড বিজনেস স্কুলের গবেষক ভেউং চান্দারা তার ‘ইনবক্স ফর প্রাইস’ গবেষণায় কিছু নেতিবাচক দিক তুলে ধরেছেন:
-
বিক্রি কমে যাওয়া: গবেষণায় দেখা গেছে, যে বিজ্ঞাপনে দাম পরিষ্কার ও স্বচ্ছভাবে লেখা ছিল (ট্রান্সপারেন্ট প্রাইসিং), সেটির বিক্রির হার ইনবক্সে দাম লুকানো বিজ্ঞাপনের চেয়ে অনেক বেশি। কারণ আধুনিক ব্যস্ত ক্রেতারা সময় নষ্ট করতে চান না।
-
সম্পদ ও সময়ের অপচয়: ইনবক্সে শত শত ক্রেতাকে সামলাতে বিক্রেতাদের অতিরিক্ত সময়, শ্রম ও জনবল (চ্যাট অপারেটর) নিয়োগ করতে হয়, যা আলটিমেটলি ব্যবসার পরিচালন খরচ বাড়িয়ে দেয়।
-
আস্থার সংকট: পেশাদারদের সামাজিক মাধ্যম ‘লিংকডইন’-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, সচেতন ক্রেতারা এই ‘ইনবক্স’ প্রক্রিয়াকে অস্বচ্ছ, প্রাচীন ও অপেশাদার মনে করেন। ফলে পেজের ওপর থেকে ক্রেতার দীর্ঘমেয়াদি আস্থা কমে যায়।
ক্রেতা হিসেবে আপনার করণীয় কী?
অনলাইন কেনাকাটায় প্রতারণা এড়াতে এবং নিজের সময় বাঁচাতে ক্রেতাদের কিছু সচেতন পদক্ষেপ নেওয়া উচিত:
১. সরাসরি কমেন্ট করুন: দাম জানতে ইনবক্সে না গিয়ে কমেন্ট সেকশনেই প্রশ্ন করুন। অনেক সময় দেখা যায় আপনার আগেই কোনো সচেতন ক্রেতা ইনবক্স থেকে দাম জেনে কমেন্টে তা ফাঁস করে দিয়েছেন। এতে আপনার সময় বাঁচবে।
২. দাম তুলনা করুন: যুক্তরাজ্যভিত্তিক ভোক্তা অধিকার সংস্থা ‘হুইচ’-এর মতে, ইনবক্সে দাম জেনেই হুট করে টাকা পাঠাবেন না। একই পণ্য অন্য পেজে বা গুগলে সার্চ করে আসল বাজারমূল্য মিলিয়ে নিন।
৩. দরকষাকষি করুন: ইনবক্সে যেহেতু বিক্রেতার সাথে সরাসরি কথা বলার সুযোগ থাকে, তাই অন্য পেজের কম দামের উদাহরণ দিয়ে ডিসকাউন্ট বা ফ্রি ডেলিভারির সুবিধা দাবি করতে পারেন।
৪. রিভিউ ও রেটিং যাচাই: ইনবক্সে যাওয়ার আগে পেজের ‘রিভিউ’ ও ‘কমেন্ট’ সেকশন স্ক্রল করুন। অন্য ক্রেতারা পণ্যটি কেমন পেয়েছে এবং কত দামে কিনেছে, তার একটি স্বচ্ছ ধারণা সেখান থেকেই পেয়ে যাবেন।
৫. অস্বচ্ছতা থাকলে এড়িয়ে চলুন: বিশ্বখ্যাত বিজনেস ম্যাগাজিন ‘ফোর্বস’ ও ‘হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ’ মনে করে, দাম নিয়ে লুকোচুরি করা ব্যবসার সততার অভাবেরই লক্ষণ। বিক্রেতা যদি দাম বলতে অতিরিক্ত গড়িমসি করেন বা জোর খাটান, তবে সেখান থেকে পণ্য না কেনাই শ্রেয়।
পরিশেষে: ডিজিটাল বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতকে আরও নির্ভরযোগ্য ও গতিশীল করতে হলে ‘ইনবক্স সংস্কৃতি’ থেকে বেরিয়ে এসে স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ নীতি বজায় রাখাই বিক্রেতাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে মঙ্গলজনক। আর ক্রেতা হিসেবে অন্ধভাবে নয়, সচেতনতার সাথে কেনাকাটা করাই হোক মূল হাতিয়ার।

