আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে প্রতিবছরের মতো এবারও পশুর হাটে কৃত্রিম উপায়ে মোটাতাজা করা ক্ষতিকর গবাদিপশু নিয়ে সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অধিক মুনাফার লোভে কিছু অসাধু খামারি ও মৌসুমি ব্যবসায়ী স্বল্প সময়ে গরুকে অস্বাভাবিকভাবে মোটাতাজা করতে স্টেরয়েড, ক্ষতিকর গ্রোথ হরমোন, ডেক্সামেথাসন এবং নিষিদ্ধ ও অতিমাত্রার বিভিন্ন ধরনের ওষুধ ব্যবহার করে থাকেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের কৃত্রিম মোটাতাজাকরণ কেবল পশুর জন্যই চরম কষ্টদায়ক নয়, বরং এর মাংস মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও মারাত্মক এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
হাটে গিয়ে কয়েকটি শারীরিক লক্ষণ ও আচরণ দেখলেই এই ধরনের অসুস্থ পশু সহজে শনাক্ত করা সম্ভব।
প্রথমত, কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা গরু সাধারণত স্বাভাবিক পশুর মতো চঞ্চল বা সক্রিয় আচরণ করে না। ওসব পশু অনেক বেশি অলস, ঝিমোনো বা ‘স্লাগিশ’ থাকে এবং এদের হাঁটাচলায় তীব্র অনীহা দেখা যায়। অনেক সময় হাটে দাঁড়িয়ে থাকলেও এরা স্বাভাবিকভাবে নড়াচড়া বা চলাফেরা করতে চায় না। ওষুধের প্রভাবে শরীরের ভেতর অতিরিক্ত মেদ ও তরল জমার কারণে পশুর ফুসফুসে চাপ পড়ে। ফলে তীব্র গরমে বা হাটের ভিড়ে এসব পশুর স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস নিতেও বেশ কষ্ট হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ক্ষতিকর স্টেরয়েডের কারণে গরুর শরীরে অতিরিক্ত চর্বি ও ক্ষতিকারক তরল জমা হয়। ফলে চামড়ার নিচে এক ধরনের কৃত্রিম ফোলা ভাব দেখা দেয়। পশুর শরীরে হাত দিয়ে জোরে চাপ দিলে সেখানে ভেতরের দিকে দাগ বা গর্তের মতো সৃষ্টি হয় এবং মাংসপেশি সহজে আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় পশুর এই শারীরিক অবস্থাকে ‘ইডিমা’ বলা হয়। এছাড়া কৃত্রিম উপায়ে মোটাতাজা করা অসুস্থ গরুর মুখ দিয়ে প্রায়শই অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত লালা পড়তে দেখা যায়। শরীরের তুলনায় অস্বাভাবিক ভারী ও ফুলে থাকা এসব পশু সহজে নড়াচড়া করতে পারে না এবং সার্বক্ষণিকভাবে ক্লান্তভাব প্রকাশ করে।
গরুকে দ্রুত মোটা করতে স্টেরয়েড, উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক বা ক্ষতিকর গ্রোথ হরমোন ব্যবহার করা হলে, রান্নার উচ্চ তাপমাত্রাতেও ওইসব উপাদানের কার্যকারিতা নষ্ট হয় না। ফলে ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদানগুলো মাংসের মাধ্যমে সরাসরি মানুষের শরীরে প্রবেশ করে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। নিয়মিত বা দীর্ঘ সময় ধরে এসব গরুর মাংস খেলে মানুষের শরীরে স্থূলতা দেখা দেওয়া, রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদে লিভার ও কিডনি অকেজো হওয়ার মতো মারাত্মক জটিল রোগের আশঙ্কা থাকে।
তবে নিয়মতান্ত্রিক ও স্বাভাবিক উপায়ে সঠিক খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে গরু মোটাতাজা করাকে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত বলে আশ্বস্ত করেছেন এই ভেটেরিনারি বিশেষজ্ঞ। তাঁর মতে, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি মেনে গরুকে নিয়মিত সুষম খাদ্য, খৈল, ভুষি, ইউরিয়া-মোলাসেস স্ট্র (ইউএমএস) এবং রাফেজ-কনসেনট্রেটের (আঁশযুক্ত ও দানাদার খাদ্য) সঠিক অনুপাত বজায় রেখে খাওয়ানো হলে প্রাকৃতিকভাবেই পশুর স্বাস্থ্য ভালো হয়। এই প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে পশুর কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে না এবং এর মাংসও মানবদেহের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ ও পুষ্টিকর থাকে। তাই কোরবানির হাটে অতিরিক্ত চকচকে ও অস্বাভাবিক মোটা গরুর পেছনে না ছুটে, সচেতনভাবে সুস্থ ও স্বাভাবিক চঞ্চল পশু কেনার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

