ঈদের রাতেও মেলেনি চোখ: মায়ের শিয়রে বসে ‘সৈনিক’ কন্যার জীবনের কঠিন যুদ্ধ

নিজস্ব প্রতিবেদক

ময়মনসিংহ, ১৩ জুলাই ২০২৬:

সারা দেশের প্রতিটি ঘরে যখন ঈদের আগের রাতের চিরচেনা আনন্দ—সেমাইয়ের মিষ্টি সুবাস আর শিশুদের কলরবে মুখরিত চারপাশ, তখন ময়মনসিংহের একটি ছোট্ট ঘরের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে কোনো উৎসবের আলো নেই, নেই কোনো আনন্দের গুঞ্জন। বরং এক ভারী নীরবতার মাঝে মায়ের শিয়রে বসে তাঁর মাথায় পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন এক তরুণী। মেয়েটির নাম ক্যামেলিয়া শারমিন চূড়া। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী। বগুড়ার মেয়ে এবং সাধারণ এক মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান তিনি। আর বিছানায় শুয়ে থাকা তাঁর মা, যিনি সারাজীবন নিঃস্বার্থভাবে শুধু দিয়েই গেছেন, আজ তিনি জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন।

নওগাঁর প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে সংগ্রামের শুরু

চূড়ার মা শাহীন সুলতানার জীবনের গল্পটা আর দশটা সাধারণ মানুষের মতো সহজ ছিল না। নওগাঁর এক প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম নেওয়া এই মহীয়সী নারীর ছোটবেলা থেকেই কেটেছে ভাঙা পরিবার আর চরম অভাবের ছায়ায়। জীবনের বাঁকে বাঁকে শুধু সংগ্রাম আর প্রতিকূলতাই ছিল তাঁর সঙ্গী। খুব অল্প বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়েছিল তাঁকে। এরপর শুরু হয় নতুন সংসার জীবন এবং একে একে কোলজুড়ে আসে তিনটি সন্তান।

শাহীন সুলতানা প্রায়ই বলতেন, “আমার পুরো জীবনটাই একটা যুদ্ধ ছিল। কিন্তু তোরা জন্মানোর পর মনে হলো, এই যুদ্ধটা জয় করার জন্য আমার জীবনে তিনজন বিশ্বস্ত সৈনিক এসে গেছে।”

সন্তানদের মানুষ করতে এক লড়াকু অভিভাবক

সেই তিন সৈনিককে মানুষের মতো মানুষ করতে গিয়ে এই মা নিজে কখনো জিরোবার অবসর পাননি। স্বামীর বদলির চাকরির সুবাদে দিনাজপুর, বগুড়া কিংবা ময়মনসিংহ—যেখানেই গেছেন, পুরো পরিবারকে এক হাতে আগলে রেখেছেন বটবৃক্ষের মতো। মধ্যবিত্তের টানাটানির সংসারে সন্তানদের জন্য কোনো প্রাইভেট টিউটর রাখার সামর্থ্য ছিল না। কিন্তু সন্তানদের শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হতে দেননি; নিজে বসেই পড়াতেন তাদের। আর চূড়ার বাবা মো. আব্দুর রহমান পাশে বসে পরম যত্নে সব বুঝিয়ে দিতেন। বাবা-মায়ের সেই ত্যাগ আর ভালোবাসার আলোতেই চূড়া আজ একাডেমিক পরীক্ষায় চমৎকার ফল করে দেশের অন্যতম শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন।

পাড়াজুড়ে যাঁর দয়া, আজ তিনি শয্যাশায়ী

এলাকার মানুষের কাছে শাহীন সুলতানা এক অনন্য ভালোবাসার নাম। পাড়ার প্রতিবেশীরা একবাক্যে স্বীকার করেন, এই মায়ের মতো দয়ালু ও পরোপকারী মানুষ তাঁরা খুব কমই দেখেছেন। তাঁর দুয়ারে কেউ একবার এলে দুবেলা না খাইয়ে তিনি কখনো ছাড়তেন না। নিজের পাত অনেক সময় খালি থেকেছে, কিন্তু অতিথির থালা কখনো শূন্য রাখতে দেননি তিনি।

দুর্ভাগ্যের বিষয়, আজ সেই চিরচেনা মমতাময়ী মা নিজেই সম্পূর্ণ অসহায়। যে হাত দুটো সারাজীবন অন্যের মুখে অন্ন তুলে দিয়েছে, যে মনটা সবসময় অপরের মঙ্গলে কেঁদেছে, আজ সেই মা শয্যাশায়ী হয়ে অন্যের একটু সাহায্য আর দোয়ার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় যে মেয়েটি নাটকের মঞ্চে জীবনের নানা রূপ ফুটিয়ে তোলেন, আজ জীবনের বাস্তব মঞ্চে মায়ের জীবন বাঁচানোর এক কঠিন ও নির্মম চরিত্রের মুখোমুখি তিনি। মধ্যবিত্তের সীমাবদ্ধতা আর মায়ের চিকিৎসার বিপুল ব্যয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে চূড়া ও তাঁর পরিবার এখন তাকিয়ে আছেন অলৌকিক কোনো সহায়তার দিকে। ঈদের চাঁদ আনন্দের বার্তা নিয়ে এলেও, চূড়ার এই ছোট্ট ঘরে এখন একটাই প্রার্থনা—তাঁর মা যেন সুস্থ হয়ে আবার ফিরে আসেন সন্তানদের মাঝে, তাঁর সেই প্রিয় ‘সৈনিক’দের কাছে।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 10   +   8   =