চকরিয়া-পেকুয়ায় বন্যা: মাতামুহুরীর ঢলে পানিবন্দী লাখো মানুষ, মৎস্য ও কৃষি খাতে কোটি টাকার ক্ষতি

কক্সবাজার প্রতিনিধি;

১২ জুলাই, ২০২৬; সন্ধ্যা ০৭:০৭ মিনিট:

সম্প্রতি টানা ৬ দিনের ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর ফলে কক্সবাজার জেলার চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে এবং পাহাড়ি ঢল ও মাতামুহুরীর উপচে পড়া পানিতে দুই উপজেলার প্রায় সবকটি গ্রাম প্লাবিত হয়ে বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। গতকাল বৃষ্টি কিছুটা কম হওয়ায় বন্যার পানি নামতে শুরু করলেও, আজ পুনরায় মুষলধারে বৃষ্টি হওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি; বরং পানির পরিমাণ অপরিবর্তিত থাকায় চকরিয়া ও পেকুয়া অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ চরম দুর্ভোগের মধ্যে সম্পূর্ণ পানিবন্দী অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। চলতি এই ভয়াবহ বন্যায় চকরিয়া ও পেকুয়া অঞ্চলের কৃষি এবং মৎস্য খাতে অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে, যেখানে ঢলের পানিতে শত শত একর ফসলী জমি তলিয়ে যাওয়ায় আমন ধানসহ চলতি মৌসুমের ব্যাপক শস্যহানি ঘটেছে। সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন স্থানীয় মৎস্য চাষীরা; বন্যার তোড়ে হাজার হাজার পুকুর, দীঘি ও মৎস্য ঘের ভেসে গিয়ে চাষকৃত কোটি কোটি টাকার মাছ ধুয়ে যাওয়ায় চাষীদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ এবং জেলা মৎস্য বিভাগের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই বন্যায় শুধুমাত্র মৎস্য খাতেই ক্ষতি হয়েছে কোটি কোটি টাকা। চকরিয়ার স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল বাশার পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে জানান, এবারের ঢলের গতি এতো বেশি ছিল যে তারা ঘরের জিনিসপত্র সরানোরও সময় পাননি, মাতামুহুরীর বাঁধ ভেঙে হু হু করে পানি ঢুকে পুরো এলাকা ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ায় এখন ঘরে একফোঁটা শুকনা খাবার নেই এবং চারদিকে শুধু পানি আর পানি বিরাজ করছে

সরেজমিনে দেখা গেছে, বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় বন্যার পানি লোকালয়ের ঘরবাড়ির চাল পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ায় ভিটেমাটি হারিয়ে সাধারণ মানুষের রাতে ঘুমানোর মতো কোনো জায়গা অবশিষ্ট নেই এবং চারদিকে তীব্র খাদ্য সংকট ও বিশুদ্ধ সুপেয় পানির হাহাকার দেখা দিয়েছে। বন্যার পানিতে অসংখ্য গৃহপালিত গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি ভেসে গেছে এবং দুর্গতদের জন্য যে সীমিত সংখ্যক আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, সেগুলোতে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত মানুষ গাদাগাদি করে অবস্থান করায় তিল ধারণের ঠাঁই নেই। এর পাশাপাশি বন্যার কর্দমাক্ত পানিতে বিষাক্ত সাপ ও ক্ষতিকারক পোকামাকড়ের উপদ্রব আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় জনমনে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। আশ্রয়কেন্দ্রের এই দুর্দশা নিয়ে স্থানীয় আলেম ও সমাজসেবক মাওলানা রশিদ আক্ষেপ করে বলেন যে, সেখানে না আছে পর্যাপ্ত খাবার, না আছে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, যার ফলে বিশেষ করে নারী ও শিশুরা চরম নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ভুগছেন এবং এই পরিস্থিতিতে সরকারি সাহায্যের পাশাপাশি বিত্তবানদের দ্রুত এগিয়ে আসা উচিত। এমতাবস্থায় চকরিয়া ও পেকুয়ায় বন্যা কবলিত দুর্গত এলাকায় যারা ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে খাদ্য ও জরুরি সহায়তা নিয়ে যাচ্ছেন, তাদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ যেন তারা সামগ্রীর তালিকায় পর্যাপ্ত পরিমাণ শুকনো খাবার (চিঁড়ে, মুড়ি, গুড়, বিস্কুট ইত্যাদি), বন্যা কবলিত নারী ও কিশোরীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় স্যানিটেশন সামগ্রী (স্যানিটারি ন্যাপকিন) এবং পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটকে (হ্যালোজেন ট্যাবলেট) সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন। স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীদের মতে, দুর্গত এলাকার এই চরম মানবিক বিপর্যয় ও ভয়াবহ দুর্দশা নিরসনে কোনো একক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, তাই দলমত ও রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে বর্তমান পরিস্থিতিতে সব স্তরের মানুষ, সামর্থ্যবান শ্রেণী এবং সামাজিক-স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে এসে দাঁড়িয়ে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করতে হবে

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 10   +   2   =