আ’য়’নাঘরের ‘মাস্টারমাইন্ড’: মেজর জেনারেল জিয়ার উত্থান-পতনের নেপথ্যে

সোহেল হাওলাদার, নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক পূর্বাচল

ঢাকা | রোববার, ১৪ জুন, ২০২৬

চৌকশ সেনা কর্মকর্তা থেকে যেভাবে আ’য়’নাঘরের মাস্টারমাইন্ড ও গুমের খলনায়ক হলেন সাবেক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান। ইলিয়াস আলী গুম, ফোনালাপ ফাঁস ও ইন্টারনেট বন্ধের চাঞ্চল্যকর তথ্য। পড়ুন দৈনিক পূর্বাচল-এর নির্বাহী সম্পাদক সোহেল হাওলাদারের বিশেষ প্রতিবেদন।

১৯৭০ সালের ৪ ডিসেম্বর ঝালকাঠির এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া শিশুটি বড় হয়েছিলেন এক বুক স্বপ্ন নিয়ে—সেনাবাহিনীর চাকচিক্যময় ইউনিফর্ম, শৃঙ্খলার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আর বুকভরা পদক। ১৯৯১ সালের ২১ জুন তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পদাতিক শাখায় কমিশন লাভ করেন। প্রশিক্ষিত কমান্ডো, স্কাই ডাইভার—সব মিলিয়ে একজন ‘চৌকশ’ সেনা কর্মকর্তা। কিন্তু সেই চৌকশ টুইস্টই যেন তাকে ধীরে ধীরে টেনে নিয়ে যায় অন্ধকারের এক ভিন্ন ও কলঙ্কিত পথে। সেই পথের শেষ প্রান্তে এসে তিনি এখন সাবেক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান—গুম, আয়নাঘর, অবৈধ গোয়েন্দা কার্যক্রম ও ফোনালাপ রেকর্ডের মূল হোতা হিসেবে অভিযুক্ত এক নাম।

প্রশ্নটা এখন সর্বত্র: কীভাবে একজন প্রশিক্ষিত সেনা কর্মকর্তা ক্ষমতার লোভ ও পদ-পদবির মোহে নিজেকে স্বৈরাচারের এক নিষ্ঠুর হাতিয়ারে রূপান্তরিত করলেন? জবাব খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হবে ২০০৯ সালে, যখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসে। তার মাত্র এক বছরের মাথায় তৎকালীন মেজর জিয়াউলকে দেওয়া হয় র‌্যাব-২-এর উপ-অধিনায়ক (ভাইস-ক্যাপ্টেন)-এর দায়িত্ব। আর এটিই ছিল তাঁর জীবনের সেই অন্ধকার বাঁক বদল।

ধাপে ধাপে উত্থান: ‘ভরসার লোক’ থেকে অভিজাত গোয়েন্দা

২০০৯ সালের ২৭ আগস্ট লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে জিয়াউল আহসান হন র‌্যাবের ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের পরিচালক। তিন বছরের মাথায় ২০১৩ সালে কর্নেল এবং একই সময়ে র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) পদ বাগিয়ে নেন। ২০১৬ সালে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হয়েই দায়িত্ব পান জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) অভ্যন্তরীণ শাখার (ইন্টারনাল অ্যাফেয়ার্স) পরিচালক হিসেবে। ২০১৭ সালে তাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) পরিচালক করা হয়। ২০২২ সালের ২১ জুলাই এনটিএমসির মহাপরিচালক (ডিজি) পদ তৈরি হলে তিনি হন এর প্রথম ডিজি এবং লাভ করেন মেজর জেনারেল পদবি।

প্রতিটি ধাপেই তিনি ছিলেন তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের সবচেয়ে ‘ভরসার লোক’। কিন্তু এই ভরসার বিনিময়ে তিনি রাষ্ট্রের ও জনগণের যে ক্ষতিগুলো করেছিলেন, সেগুলো আজ দেশের সামনে এক বিকট অপরাধের খতিয়ান।

আ’য়’নাঘর: গুমের এক কালো অধ্যায়

জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো—তিনি ছিলেন কুখ্যাত গোপন বন্দিশালা ‘আ-য়-নাঘর’-এর জনক। এই গোপন প্রকোষ্ঠে তুলে নিয়ে যাওয়া হতো তৎকালীন সরকারের ভিন্নমতাবলম্বী ও রাজনৈতিক বিরোধীদের; বছরের পর বছর গুম করে রাখা হতো তাদের। ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি প্রাথমিক জবানবন্দিতে আয়নাঘর তৈরি এবং ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের নেতা-কর্মীদের ওপর নৃশংস হামলায় তাঁর সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন, যদিও পরবর্তীতে আদালতের শুনানিতে তিনি কৌশলগতভাবে তা অস্বীকার করেন।

আ’য়’নাঘর শুধু একটি গোপন কক্ষ ছিল না—এটি ছিল রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের এক জীবন্ত প্রতীক। সেখানে যাদের পাঠানো হয়েছে, তাদের অনেকেই আর আলো পৃথিবীতে ফিরে আসেনি। ২০০৯ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বিএনপি-জামায়াতের শতাধিক নেতাকর্মী গুম-খুনের শিকার হন, যার তালিকায় রয়েছেন ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, সাজেদুল ইসলামের মতো হাইপ্রোফাইল ব্যক্তিরা।

‘মিশন ইলিয়াস আলী’: ফ্লাইটেই শিকারের পিছু নেওয়া

গোয়েন্দা সূত্রের রোমহর্ষক তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল বিকেল ৩টায় সিলেট থেকে বিমানযোগে ঢাকায় আসেন বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী। ওই রাতেই হোটেল শেরাটন থেকে বাসায় ফেরার পথে তাকে গুম করা হয়। চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে যে, জিয়াউল আহসান নিজেই ওই ফ্লাইটের যাত্রী হয়ে ইলিয়াস আলীকে ঢাকা পর্যন্ত অনুসরণ করেছিলেন। তিনি শুধু পরিকল্পনাকারীই ছিলেন না, বরং মাঠপর্যায়ে ‘মিশন’ বাস্তবায়নে সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন।

নারায়ণগঞ্জের সাত খুন: ‘বেঁচে যাওয়া’ অভিযুক্ত

২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের ঘটনার নেপথ্যেও জড়িত থাকার তীব্র অভিযোগ ওঠে তদানীন্তন র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে। সে সময় হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও তৎকালীন সরকারের শীর্ষ মহলের আস্থাভাজন হওয়ায় তিনি সে যাত্রা ‘বেঁচে যান’। তবে বর্তমানে সাবেক আইনমন্ত্রী, সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাসহ বহু আসামির দণ্ড হওয়ার পর জিয়াউলের নামটি ওই হত্যাকাণ্ডের মূল মাস্টারমাইন্ড হিসেবে নতুন করে আলোচিত হচ্ছে।

ফোনালাপ রেকর্ড ও ক্ষমতার চরম অপব্যবহার

এনটিএমসিতে দায়িত্ব পাওয়ার পর জিয়াউল আহসান প্রযুক্তিকে নোংরা পন্থায় ব্যবহার শুরু করেন। তিনি সরকারদলীয় ও বিরোধীদলীয় উচ্চপদস্থ নেতাদের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ব্যক্তিগত ফোনালাপও অবৈধভাবে রেকর্ড করতেন। বিরোধী দলের নেতাদের ব্যক্তিগত ফোনালাপ বিকৃত বা কাটছাঁট করে তা টেলিভিশনে প্রচারের মাধ্যমে চরিত্রহননের নীলনকশা বাস্তবায়ন করতেন তিনি, যা নাগরিকদের সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন।

এমনকি ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের শেষ সময়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, আইজিপি ও একাধিক মন্ত্রীর ফোনালাপের যে সারাংশ গণভবন থেকে উদ্ধার হয়, তার নেপথ্যেও ছিলেন এই জিয়াউল আহসান।

ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট: প্রযুক্তিকে অস্ত্র বানালেন যেভাবে

২০২৪ সালের ১৭ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলন দমনে দেশজুড়ে মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশ আসে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রে জানা যায়, তৎকালীন তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ও মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান সরাসরি ডাটা সেন্টারগুলো বন্ধ করতে বাধ্য করেছিলেন। একজন সেনা কর্মকর্তা হয়ে দেশের কোটি কোটি নাগরিকের তথ্য অধিকার ও ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করার এই হীন সিদ্ধান্ত আজ বড় অপরাধের নজির।

শেষ পরিণতি: ‘চৌকশ’ থেকে ‘স্বৈরাচার’

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরদিনই (৬ আগস্ট) জিয়াউল আহসানকে চাকরিচ্যুত ও এনটিএমসির মহাপরিচালকের দায়িত্ব থেকে অপসারণ করা হয়। এরপর একাধিক সুনির্দিষ্ট মামলায় গ্রেফতার হয়ে তিনি এখন আদালতের কাঠগড়ায়।

সোশ্যাল মিডিয়ায় আওয়ামী লীগের আইটি সেল বা তাদের অনুগতরা জিয়াউলকে ‘দেশপ্রেমিক রত্ন’ বা ‘পদকজয়ী অফিসার’ বলে সত্য ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা করলেও, আদালতের নথি ও গোয়েন্দা প্রতিবেদন প্রমাণ করে—তিনি ছিলেন গুম ও আয়নাঘরের মূল কারিগর। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিহাসে অনেক উজ্জ্বল নাম থাকলেও, জিয়াউল আহসানের নামটি যুক্ত হলো সেনা শৃঙ্খলাকে পুঁজি করে ক্ষমতার অপব্যবহার, গুম এবং গোপন কারাগার নির্মাণের এক অন্ধকার ও কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে।

 জিয়াউল আহসান আয়নাঘর, গুমের মাস্টারমাইন্ড জিয়াউল, এনটিএমসি ডিজি জিয়াউল, ইলিয়াস আলী গুম , দৈনিক পূর্বাচল, সাত খুন জিয়াউল আহসান,

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 9   +   9   =