মেসির জাদুকরী নির্মাণ

ক্রীড়া প্রতিবেদক, দৈনিক পূর্বাচল

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর রোমাঞ্চকর সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে আর্জেন্টিনা। দুটি নিখুঁত অ্যাসিস্টে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিলেন ৩৯ বছর বয়সী জাদুকর লিওনেল মেসি। বিস্তারিত পড়ুন দৈনিক পূর্বাচল-এ।

২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে হেরে যখন তিনি অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন, কিংবা ২০১৮ বিশ্বকাপের ভরাডুবির পর যখন অভিমানে জাতীয় দল থেকে সাময়িক বিরতি নিয়েছিলেন—তখন যদি তিনি আর ফিরে না আসতেন? নক্ষত্র যদি এক আকাশ আঁধার দেখে ঝরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিত, পৃথিবী হয়তো কোনোদিনই টের পেত না আলোর আনন্দ। তেমনি লিওনেল মেসি না ফিরলেও অজানা থাকত, ছোট মানুষটির পায়ে কত মাধুর্য লুকিয়ে ছিল বিশ্বকাপের জন্য। ফুটবল ঈশ্বরও তখন আফসোস করতেন এক বুক হাহাকার নিয়ে!

কিন্তু তিনি ফিরেছেন। কাতার বিশ্বকাপ থেকে যে ফুটবল জাদু তিনি শুরু করেছিলেন, ৩৯ বছর বয়সে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতেও তার রেশ কাটেনি। প্রতিটি ম্যাচে তিনি রচনা করে চলেছেন ফুটবল আনন্দের অমর সিম্ফনি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম প্রতিযোগিতামূলক মুখোমুখিতে হয়তো ডিয়েগো ম্যারাডোনার মতো একাই বল ড্রিবল করে গোল করেননি, কিন্তু যা করেছেন, তা কি কম বিস্ময়কর! গোলের নায়ক না হয়েও জয়ের মূল স্থপতি হয়ে রইলেন লিওনেল মেসি। পিছিয়ে পড়া দলের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে দুটি নিখুঁত অ্যাসিস্টে ইংল্যান্ডের স্বপ্ন ভেঙে আর্জেন্টিনাকে পৌঁছে দিয়েছেন টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ফাইনালে। ম্যারাডোনা ইতিহাসটা লিখেছিলেন ‘হাতে-পায়ে’, আর মেসি তার মাথা ও সৃজনশীলতায় লিখলেন মহাকাব্যের নতুন এক অধ্যায়, যেখানে গোলের চেয়েও বড় হয়ে ধরা দিয়েছে গোল বানিয়ে দেওয়ার শিল্প।

কৌশল বদলে ম্যাচ ঘুরিয়ে দিলেন মেসি

মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই হাইভোল্টেজ সেমিফাইনালের প্রথমার্ধে কড়া মার্কিংয়ে একদম নজরবন্দি ছিলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। তবে ৫৫ মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে ইংল্যান্ড এগিয়ে যাওয়ার পর আর আটকে রাখা যায়নি এই জাদুকরকে। ইংলিশ রক্ষণভাগ যখন রক্ষণে গুটিয়ে যাচ্ছিল, তখনই মেসি কৌশলী চাল চালেন; তিনি সরে যান মাঠের ডান প্রান্তে। আর সেখানেই বদলে যায় ম্যাচের পুরো গল্প।

ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্তিনেস মেসির এই পজিশন পরিবর্তন নিয়ে বলেন, “মেসিকে উইংয়ে নিয়ে যাওয়াটাই ছিল আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।”

যে মানুষটা একসময় নিজের পায়ের জাদুতে একাই ম্যাচের ভাগ্য লিখতেন, সময়ের সঙ্গে তিনিই হয়ে গেলেন সেরা নির্মাতা। উইঙ্গারের ভূমিকায় নেমে যেন নতুন করে আবিষ্কার করেছেন নিজেকে। মেসির আত্মজীবনীর লেখক গিয়েম বালাগে যেমনটা বলেছিলেন—কৌশল ও সময়ের প্রয়োজনে মেসি অন্তত পাঁচবার বদলেছেন নিজেকে। সেমিফাইনালে পুরো ম্যাচজুড়ে একের পর এক ক্রস ফেলেছেন তিনি ইংল্যান্ডের বক্সে। গোলকিপার জর্ডান পিকফোর্ড কয়েকটি দুর্দান্ত সেভ করেও শেষ রক্ষা করতে পারেননি।

শেষ মুহূর্তের রোমাঞ্চ ও লাউতারোর মহাকাব্যিক ফিনিশ

ম্যাচের ৮৫ মিনিটে মেসির পাস থেকেই দূরপাল্লার জোরালো শটে আর্জেন্টিনার সমতা ফেরান এনসো ফের্নান্দেস। তবে আসল নাটক তখনও বাকি ছিল। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের পর যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে যাচ্ছিল ম্যাচ, ঠিক তখনই ইনজুরি টাইমের (৯২ মিনিটে) মেসির মাপা নিখুঁত ক্রসে বদলি হিসেবে নামা লাউতারো মার্তিনেসের লক্ষ্যভেদী হেডে পরাস্ত হন পিকফোর্ড। আর তাতেই ২-১ গোলের নাটকীয় জয়ে বিশ্বজয়ের মুকুট ধরে রাখার মিশনে ফাইনালে পা রাখে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ ইউরোপিয়ান জায়ান্ট স্পেন।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 8   +   1   =