অনলাইন ডেস্ক, দৈনিক পূর্বাচল | ২৬ জুন ২০২৬
“ফিরে এলো আজ সেই মোহরম মাহিনা, ত্যাগ চাই, মর্সিয়া-ক্রন্দন চাহি না…!”
আজ শুক্রবার, পবিত্র ১০ই মহরম—মহিমান্বিত আশুরা। ইসলামের ইতিহাসে এই দিনটি অসামান্য বরকত, মাহাত্ম্য ও গভীর তাৎপর্যে ভাস্বর। ইবাদত-বন্দেগির জন্য অতুলনীয় হলেও, কারবালার প্রান্তরের মর্মন্তুদ ও সকরুণ শোকগাথা এই দিবসটিকে এক গভীর বিষাদময় রূপ দিয়েছে।
হিজরি ৬১ সালের এই দিনে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে ফোরাত নদীর তীরে কারবালার প্রান্তরে শাহাদত বরণ করেন। ফলে মুসলিম উম্মাহর কাছে এটি যেমন চরম শোকের দিন, তেমনি সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার এক অনন্য প্রেরণার দিন।
মহরম ও আশুরা নিয়ে প্রচলিত কিছু কুসংস্কার
হাদিস শরিফে মহরম মাসকে ‘শাহরুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর মাস’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এই দিন আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় হওয়ায় রোজা পালনকারীদের জন্য রয়েছে বহুগুণ সওয়াব। তবে আমাদের সমাজে আশুরা ও মহরমকে কেন্দ্র করে কিছু মনগড়া ভুল ধারণা ও কুসংস্কার প্রচলিত রয়েছে:
-
উৎসব ও সামাজিক কাজ বর্জন: এই মাসে বিয়েশাদি না করা, নতুন বাড়ি তৈরি না করা, কিংবা সুন্দর পোশাক না পরা সম্পূর্ণ কুসংস্কার।
-
খাদ্যাভ্যাসে বিধিনিষেধ: মাংস না খেয়ে নিরামিষ খাওয়া, কিংবা আশুরার দিন খিচুড়ি, হালুয়া-রুটি রান্না ও বিতরণ করাকে জরুরি বা সওয়াবের কাজ মনে করার কোনো ধর্মীয় ভিত্তি নেই।
-
ভুল বিশ্বাস ও নিষিদ্ধ আচরণ: চোখে সুরমা লাগালে চোখ ভালো থাকে—এমন কোনো সহিহ প্রমাণ নেই। এছাড়া, কারবালার শোক স্মরণে নিজেদের শরীরে আঘাত করে রক্তপাত ঘটানো ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
মনে রাখা প্রয়োজন: আশুরার দিনের একমাত্র সহিহ ও প্রমাণিত আমল হলো রোজা রাখা।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী এবং সরকারি ছুটি
পবিত্র আশুরা উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী প্রদান করেছেন। বাণীতে তাঁরা আশুরার মহান শিক্ষাকে বুকে ধারণ করে একটি শান্তিপূর্ণ, মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানান।
আজ এই দিবসটি উপলক্ষ্যে সব সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সংবাদপত্র অফিসে সাধারণ ছুটি থাকবে। দিনটি পালনে ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন বিশেষ আলোচনা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছে। টেলিভিশন ও রেডিওতে প্রচারিত হচ্ছে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা।
পুরান ঢাকায় হোসেনী দালানের প্রস্তুতি ও ঐতিহ্যবাহী তাজিয়া মিছিল
প্রতি বছরের মতো এবারও সকাল ১০টায় রাজধানীর হোসেনী দালান ইমামবাড়া থেকে ঐতিহ্যবাহী তাজিয়া মিছিল বের করা হবে। মিছিলটি লালবাগ ও আজিমপুর হয়ে ঝিগাতলায় গিয়ে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার মাগরিবের নামাজের পর থেকেই হোসেনী দালানে শুরু হয়েছে আনুষ্ঠানিকতা। খুতবা পাঠ, আশুরার তাৎপর্য নিয়ে বয়ান এবং ইমাম হোসাইন (রা.)-এর প্রতীকী গিলাফে শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে ভক্ত-অনুরাগীরা দিনটি স্মরণ করছেন।
তাজিয়া মিছিলে ডিএমপির কড়া নিরাপত্তা ও নিষেধাজ্ঞা
আশুরা ও তাজিয়া মিছিল যেন শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ পরিবেশে সম্পন্ন হতে পারে, সেজন্য ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) বিশেষ নিরাপত্তামূলক নির্দেশনা জারি করেছে:
-
অস্ত্র ও ধাতব বস্তু নিষিদ্ধ: মিছিলে কোনো ধরনের ধারালো ধাতব বস্তু, ছুরি, চাকু, লাঠি, ছোরা, তরবারি, বর্শা বহন করা যাবে না।
-
নিশানের উচ্চতা: মিছিলে ব্যবহৃত নিশানের উচ্চতা ১২ ফুটের বেশি হওয়া যাবে না।
-
আতশবাজি ও শব্দদূষণ রোধ: কোনো ধরনের পটকা, আতশবাজি এবং উচ্চমাত্রার শব্দ সৃষ্টিকারী পিএ সিস্টেম বা ঢাক-ঢোল বাজানো নিষিদ্ধ।
-
তল্লাশি চৌকি: সন্দেহজনক কোনো ব্যাগ, সুটকেস, ছাতা বা কুকার জাতীয় প্যাকেট নিয়ে মিছিলে প্রবেশ করা যাবে না।

