বিনোদন ডেস্ক:
সময়টা ১৯৯৩ সাল। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে তখন পরিবর্তনের হাওয়া। ঠিক সেই মুহূর্তে ঢালিউডের রূপালি পর্দায় এক সুঠাম দেহ ও মায়াবী চেহারার তরুণের অভিষেক ঘটে। মোহাম্মদ হোসেন পরিচালিত ‘অবুঝ দুটি মন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রূপালি জগতে পা রাখা সেই তরুণ আর কেউ নন, তিনি আমাদের সবার প্রিয় অভিনেতা আমিন খান। প্রথম ছবিতেই দর্শক হৃদয়ে জায়গা করে নিয়ে যে যাত্রার শুরু হয়েছিল, তা আজ তিন দশক পেরিয়েও সমান উজ্জ্বল। অ্যাকশন, রোমান্টিক, সামাজিক কিংবা পারিবারিক—সব ঘরানার ছবিতেই আমিন খান ছিলেন এক অপরিহার্য নাম।
রোমান্টিক হিরো থেকে অ্যাকশন কিং
ক্যারিয়ারের শুরুতে শাবনূর, সোনিয়া, শিল্পী কিংবা ঋতুপর্ণার মতো জনপ্রিয় নায়িকাদের সঙ্গে জুটি বেঁধে একের পর এক রোমান্টিক চলচ্চিত্র উপহার দেন আমিন খান। ‘দুনিয়ার বাদশা’, ‘হৃদয় থেকে হৃদয়’, ‘চিরদিনের সাথী’ কিংবা ‘হৃদয় আমার’ ছবিগুলোর মাধ্যমে তিনি তরুণ প্রজন্মের আইকন হয়ে ওঠেন।
তবে শুধু রোমান্টিক চকোলেট বয় ইমেজে নিজেকে আটকে রাখেননি এই বৈচিত্র্যময় অভিনেতা। নব্বই দশকের শেষের দিকে এবং দুই হাজার সালের শুরুতে ঢালিউডে যখন অ্যাকশন ঘরানার সিনেমার জোয়ার আসে, তখন আমিন খান নিজেকে একজন সফল অ্যাকশন হিরো হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন। ‘মৃত্যুর মুখে’, ‘কাটা রাইফেল’, ‘কঠিন বাস্তব’, ‘মাস্তান নাম্বার ওয়ান’-এর মতো ব্লকবাস্টার অ্যাকশন ছবিগুলো আমিন খানকে এনে দেয় তুমুল বাণিজ্যিক সাফল্য। বিশেষ করে মুনমুন, ময়ূরী এবং পলি’র সঙ্গে তার অ্যাকশন ঘরানার রসায়ন সেই সময়ে প্রেক্ষাগৃহগুলোতে দর্শক উপচে পড়া ভিড় তৈরি করেছিল।
কালজয়ী ‘আম্মাজান’ ও অনন্য উচ্চতা
আমিন খানের ক্যারিয়ারের কথা বললে যে চলচ্চিত্রটির নাম সবার আগে আসবে, সেটি হলো কাজী হায়াৎ পরিচালিত কালজয়ী সিনেমা ‘আম্মাজান’ (১৯৯৯)। এই চলচ্চিত্রে মৌসুমীর বিপরীতে তার অভিনয় এবং ছবির গল্পটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক মাইলফলক হয়ে আছে। আমিন খানের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স ছবিটিকে সাধারণ দর্শক থেকে শুরু করে সমালোচক—সবার কাছেই প্রশংসিত করে তোলে। এছাড়া পূর্ণিমা ও নিপুনের সঙ্গে করা তার পারিবারিক ও সামাজিক গল্পের সিনেমাগুলোও দর্শকদের আবেগতাড়িত করেছে।
পরিবর্তনের হাওয়া ও ভিন্নধর্মী চরিত্রে ফেরা
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চলচ্চিত্রের গল্প ও নির্মাণশৈলীতে পরিবর্তন এলেও আমিন খান হারিয়ে যাননি। ২০১১ সালের পর থেকে তিনি চলচ্চিত্রে সংখ্যার চেয়ে মানের দিকে বেশি মনোযোগ দেন। বাণিজ্যিক ধারার পাশাপাশি তিনি ঐতিহাসিক ও বাস্তবধর্মী গল্পে কাজ শুরু করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ‘ও আমার দেশের মাটি’ কিংবা ঐতিহাসিক পটভূমিতে নির্মিত ‘ফরায়েজী আন্দোলন ১৮৪২’ চলচ্চিত্রে তার পরিপক্ব অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করে। এমনকি ২০২৫ সালের শেষের দিকে মুক্তি পাওয়া সাদেক সিদ্দিকী পরিচালিত ‘ডাইরেক্ট অ্যাটাক’ চলচ্চিত্রেও পপির বিপরীতে তার উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, রূপালি পর্দার জন্য তার আবেদন এখনো ফুরিয়ে যায়নি।
তিন দশকের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়
প্রায় ১৭০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করা আমিন খান শুধু একজন অভিনেতাই নন, তিনি ঢালিউডের একটি সোনালী প্রজন্মের সাক্ষী ও সারথি। ওবায়দুল প্রধান, বাদল খন্দকার, মনতাজুর রহমান আকবর, এফ আই মানিক, মালেক আফসারীর মতো গুণী পরিচালকদের হাত ধরে তিনি ঢাকাই সিনেমাকে সমৃদ্ধ করেছেন। দীর্ঘ এই পথচলায় নানা উত্থান-পতন এলেও আমিন খান তার অভিনয়, ব্যক্তিত্ব এবং পেশাদারিত্ব দিয়ে ধরে রেখেছেন ইমেজ।

