আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সাধারণ মানুষের ব্যয় কমাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর ছাড়ের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে উচ্চমূল্যের ভোগ্য পণ্যের ওপর করের চাপ বাড়ানোর পরিকল্পনাও করা হয়েছে।
বাজেট সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে চাল, ডাল, ভোজ্য তেল, চিনি, আটা, ময়দা, পেঁয়াজ ও বিভিন্ন মসলার মতো নিত্যপণ্যের ওপর বিদ্যমান ১ শতাংশ উত্স কর প্রত্যাহারের চিন্তা করছে সরকার। একই সঙ্গে এসব পণ্যের ওপর থাকা ১ শতাংশ টার্নওভার করও যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বাজার অস্থিরতার মধ্যে সাধারণ মানুষের ব্যয় কিছুটা কমাতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘আগামী বাজেটে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে উচ্চবিত্ত ও বিলাসী খাত। যাদের সামর্থ্য বেশি, তাদের কাছ থেকেই বেশি রাজস্ব আদায়ের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।’
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গত কয়েক বছরে ডলার-সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি খরচ ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে নিত্যপণ্যের বাজারে চাপ বেড়েছে। এতে সীমিত আয়ের মানুষ ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে। চাল, ডাল, ভোজ্য তেল ও চিনির মতো পণ্যের দাম বাড়তে থাকায় জীবনযাত্রার ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এ পরিস্থিতিতে কর কমানোর মাধ্যমে আমদানি ও সরবরাহ পর্যায়ে ব্যবসায়ীদের ব্যয় কিছুটা কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে এনবিআর। তবে কর্মকর্তারা এটিও স্বীকার করছেন যে, শুধু কর কমালেই বাজারে তাত্ক্ষণিক বড় পরিবর্তন আসবে না। কারণ পণ্যের দামে পরিবহন ব্যয়, মজুতদারি, আমদানিনির্ভরতা ও সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতার মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই কর ছাড়ের সুবিধা ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে বাজার তদারকি বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
আসছে বাজেটে, বিলাসবহুল প্রাইভেট কার, জিপ, হেলিকপটার ও বিমানের ওপর বাড়তি আয়কর আরোপের পরিকল্পনা করেছে সরকার। পরিবেশবান্ধব হলেও উচ্চমূল্যের বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপরও অগ্রিম আয়কর বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। তবে মধ্যবিত্তের ব্যবহারের সাধারণ গাড়ির ক্ষেত্রে বিদ্যমান সিসিভিত্তিক করকাঠামো অপরিবর্তিত থাকতে পারে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স নবায়নে কর বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। বর্তমানে পিস্তল, রিভলভার বা শটগানের লাইসেন্স নবায়নে কোনো অগ্রিম আয়কর দিতে হয় না। তবে নতুন বাজেটে অস্ত্রভেদে ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অগ্রিম আয়কর আরোপের প্রস্তাব এসেছে।
এবারের বাজেটে প্রথম বারের মতো ব্যাটারিচালিত রিকশাকেও করের আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন এলাকায় বছরে ৫ হাজার টাকা এবং পৌরসভা এলাকায় ২ হাজার টাকা কর নির্ধারণ করা হতে পারে।
সম্পদ কর :
উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তিদের করের আওতায় আরো কার্যকরভাবে আনতে ‘সম্পদ কর’ বা ওয়েলথ সারচার্জ ব্যবস্থায় পরিবর্তনের চিন্তা করছে সরকার। একাধিক বাড়ি, উচ্চমূল্যের জমি, বিলাসবহুল গাড়ি ও নগদ সম্পদের ভিত্তিতে কর নির্ধারণে কড়াকড়ি বাড়তে পারে। এনবিআর সূত্র বলছে, করযোগ্য সম্পদ গোপন ঠেকাতে ব্যাংক হিসাব, জমির রেজিস্ট্রি, গাড়ির নিবন্ধন ও সঞ্চয়পত্রের তথ্য সমন্বয়ের কাজ চলছে। বিশেষ করে যাদের দৃশ্যমান সম্পদ ও আয়কর রিটার্নের তথ্যের মধ্যে অসামঞ্জস্য রয়েছে, তাদের নজরদারিতে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশে সম্পদ বা অর্থ পাচারের তথ্য যাচাইয়েও আন্তর্জাতিক তথ্য আদান-প্রদান জোরদার করার আলোচনা চলছে।
প্রণোদনার পরিবর্তন আসতে পারে :
বিভিন্ন খাতে দীর্ঘদিনের কর অব্যাহতি ও প্রণোদনাসুবিধা পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বড় শিল্পগোষ্ঠী ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় কর ছাড় সীমিত করার আলোচনা রয়েছে। রপ্তানিমুখী কিছু খাতে বিদ্যমান কর অবকাশ ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা হতে পারে। একই সঙ্গে নতুন শিল্পে বিনিয়োগ উত্সাহিত করতে প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ ও হাইটেক খাতে সীমিত মেয়াদের কর প্রণোদনা অব্যাহত থাকতে পারে।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ভ্যাটের আওতায় আনার উদ্যোগ :
উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মুদি দোকান, মোবাইল ফোন ও ইলেকট্রনিক্স ব্যবসায়ী, স্থানীয় পাইকারি দোকান এবং ছোট রেস্তোরাঁগুলোকে ভ্যাট নেটের আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। এজন্য সহজ প্যাকেজ ভ্যাট ব্যবস্থা চালুর চিন্তা করা হচ্ছে। মাসিক নির্দিষ্ট অঙ্কের ভ্যাট দিয়ে সহজে নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়া হবে। এনবিআর মনে করছে, বর্তমানে বিপুল সংখ্যক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কর ও ভ্যাট ব্যবস্থার বাইরে থাকায় সরকার উল্লেখযোগ্য রাজস্ব হারাচ্ছে।
কোমল পানীয় ও প্রসাধনীতে বাড়তি ভ্যাট :
কার্বনেটেড বেভারেজ, এনার্জি ড্রিংক, আইসক্রিম, ফলের জুস ও বিভিন্ন প্রসাধনী সামগ্রীর ওপর ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক বাড়তে পারে। এনবিআরের যুক্তি হচ্ছে, এসব পণ্য মূলত অপ্রয়োজনীয় বা বিলাসী ভোগের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে উচ্চ আয়ের ভোক্তাদের কাছ থেকে বেশি রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে।
ভোজ্য তেল ও শিল্প কাঁচামালে কর সমন্বয় :
রেড সিড অয়েল, ক্যানোলা অয়েল, কোলজা সিডস অয়েলসহ কিছু আমদানিনির্ভর পণ্যের ওপর ভ্যাট বাড়ানোর আলোচনা রয়েছে। অন্যদিকে উত্পাদন খরচ কমাতে কিছু শিল্প কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যে শুল্ক কমানো হতে পারে। স্থানীয় শিল্পসুরক্ষা ও আমদানিনির্ভরতা কমানোর বিষয়টি মাথায় রেখেই করকাঠামো পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
ডিজিটাল ও অনলাইন সেবায় কর নজরদারি :
ফেসবুক, ইউটিউব, গুগলসহ বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফরম থেকে বিজ্ঞাপন ও অনলাইন সেবা গ্রহণে ভ্যাট আদায় আরো কঠোরভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ই-কমার্স ও অনলাইনভিত্তিক ব্যবসার লেনদেন নজরদারিতে আনতে স্বয়ংক্রিয় তথ্য বিনিময় ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
মোটরসাইকেল ও যানবাহনে নতুন কর :
মোটরসাইকেল মালিকদের প্রথম বারের মতো সিসিভিত্তিক অগ্রিম আয়করের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে উচ্চমূল্যের গাড়ি, জিপ, হেলিকপটার ও ব্যক্তিগত বিমানের ওপর বাড়তি কর আরোপের মাধ্যমে উচ্চবিত্ত শ্রেণি থেকে রাজস্ব বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ব্যাটারিচালিত রিকশা নিবন্ধন ও কর :
অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত রিকশাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে নিবন্ধন ও কর আরোপের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা এলাকায় আলাদা হারে বার্ষিক কর নির্ধারণ হতে পারে। সরকারের ধারণা, এতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজস্বও বাড়বে।

