বড় হচ্ছে কোরবানির বাজার

ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজধানীর গাবতলীসহ দেশের বিভিন্ন পশুর হাটে এখন চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। আর কয়েক দিনের মধ্যেই এসব হাটে জমে উঠবে কোরবানির পশু কেনাবেচা। শুধু রাজধানী নয়, সারা দেশেই এখন একই চিত্র। কোথাও খামারিরা পশু নিয়ে হাটে উঠতে ব্যস্ত, কোথাও চলছে শেষ মুহূর্তের পরিচর্যা।

 

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, দেশে প্রতি বছর কোরবানির বাজার ক্রমাগত বড় হচ্ছে। গত এক দশকে কোরবানির পশুর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। ফলে ঈদুল আজহাকে ঘিরে দেশের কোরবানির বাজার এখন আর শুধু ধর্মীয় আয়োজন নয়, এটি বিশাল এক মৌসুমি অর্থনীতিও। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্র বলেছে, ২০১৫ সালে যেখানে ৮৫ থেকে ৮৮ লাখ পশু কোরবানি হয়েছিল, সেখানে ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা পৌঁছায় প্রায় ১ কোটি ৪ লাখে। অর্থাৎ এক দশকে দেশে কোরবানির পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ১৭ থেকে ১৮ লাখ। তবে করোনা ভাইরাস মহামারির সময় ২০২০ সালে এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে ২০২৫ সালে কোরবানির পশুর সংখ্যা কমে যায়। চলতি বছর আসন্ন কোরবানির ঈদে আগের যে কোনো বছরের তুলনায় বেশি পরিমাণ পশু কোরবানি করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। সম্প্রতি সচিবালয়ে এ বছর কোরবানির পশুর চাহিদা নিরূপণ ও সরবরাহ বিষয়ক এক সংবাদ সম্মেলনে মত্স্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, এবার কোরবানির জন্য ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি পশুর সরবরাহ পাওয়া যাবে। তবে চাহিদা রয়েছে ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি পশু।

ধীরে ধীরে বড় হয়েছে বাজার

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, আজ কোরবানির যে এত বড় বাজার তা ধীরে ধীরে বড় হয়েছে। ২০১৫ সালে দেশে আনুমানিক ৮৫ থেকে ৮৮ লাখ পশু কোরবানি হয়েছিল। ২০১৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৯০ থেকে ৯২ লাখে। ২০১৭ সালে ৯৫ থেকে ৯৭ লাখ এবং ২০১৮ সালে প্রায় ৯৮ থেকে ৯৯ লাখ পশু কোরবানি হয়। ২০১৯ সালে দেশে কোরবানির পশুর সংখ্যা প্রথম বারের মতো ১ কোটির ঘরে পৌঁছায়। ঐ বছর প্রায় ১ কোটি ১ লাখ পশু কোরবানি হয়েছিল প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে। এরপর ২০২১ সালে প্রায় ৯০ লাখ ৯০ হাজার, ২০২২ সালে প্রায় ৯৯ লাখ ৫০ হাজার এবং ২০২৩ সালে প্রায় ১ কোটি পশু কোরবানি হয়। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ৪ লাখে। এই ধারাবাহিক বৃদ্ধির পেছনে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে দেশীয় খামারভিত্তিক উত্পাদন বৃদ্ধিকে। গত এক দশকে দেশের বিভিন্ন জেলায় ছোট ও মাঝারি খামারের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। আগে যেখানে ভারতীয় গবাদি পশুর ওপর নির্ভরতা ছিল বেশি, এখন দেশীয় উত্পাদনই বাজারের প্রধান জোগান দিচ্ছে।

প্রাণিসম্পদ খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোরবানির বাজারকে কেন্দ্র করে এখন বিশাল একটি অর্থনৈতিক চক্র গড়ে উঠেছে। পশুখাদ্য, ভুট্টা, খড়, পরিবহন, হাট ইজারা, অস্থায়ী শ্রমবাজার, মোবাইল আর্থিক সেবা থেকে শুরু করে চামড়া শিল্প—সব খাতেই এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

কোভিডে প্রথম বড় ধাক্কা

এই ধারাবাহিক বৃদ্ধির মাঝেই ২০২০ সালে করোনা ভাইরাস মহামারির সময় কোরবানির সংখ্যা কমে যায়। ঐ বছর প্রায় ৯৪ লাখ ৫০ হাজার পশু কোরবানি হয়েছিল। সেই সময় দেশে দীর্ঘ লকডাউন, আয় কমে যাওয়া এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে অনেক পরিবার ব্যয় সংকোচন করে।

মূল্যস্ফীতির চাপে আবার কমে কোরবানি

২০২৪ সালে দেশে প্রায় ১ কোটি ৪ লাখ পশু কোরবানি হলেও ২০২৫ সালে তা নেমে আসে প্রায় ৯১ লাখ ৩৬ হাজারে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পতনের পেছনে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আয়চাপ বড় কারণ হতে পারে। গত কয়েক বছরে পশুখাদ্য, খড়, ভুসি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় গরুর দামও বেড়েছে। ফলে অনেক পরিবার কম বাজেটের কোরবানির দিকে ঝুঁকেছে। খামারিরা বলেছেন, বড় গরুর চাহিদা কিছুটা কমেছে। অন্যদিকে যৌথ কোরবানি বেড়েছে। অনেক ক্রেতা এখন আগের মতো ‘বড় গরু’ নয়, বরং ‘সাশ্রয়ী গরু’ খুঁজছেন।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ এলাকার একটি এগ্রো ফার্মের স্বত্বাধিকারী আমিনুল ইসলাম বলেন, একদিকে বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা, অন্যদিকে গোখাদ্যের দাম, শ্রমিকের মজুরিসহ অন্যান্য খরচ অস্বাভাবিক বেড়েছে। ফলে খামারের দৈনন্দিন পরিচালনা ব্যয় এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। যার প্রভাব পড়বে কোরবানির পশুর দামের ওপর। তিনি বলেন, এ বছর ঈদে কোরবানির পশুর সরবরাহ বাড়লেও দাম কমার সুযোগ নেই। উত্পাদন ব্যয় বাড়ার কারণে এমনতিই খামারিরা দিশেহারা অবস্থায় আছে বলে তিনি জানান।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক মুস্তফা কে মুজেরী এ প্রসঙ্গে   বলেন, শিক্ষিত তরুণরা অনেকেই এখন খামার করতে এগিয়ে আসছে। যে কারণে গত কয়েক বছরে এ খাতে ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর পেছনে বড় একটি কাজ করেছে, পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে পশু আমদানি বন্ধ থাকার কারণে। তিনি বলেন, এখন আমাদের খামারিদের উচিত মানসম্মত পশু উত্পাদনে গুরুত্ব দেওয়া। আর সরকারের উচিত বাজার ব্যবস্থার উন্নয়নে নজর দেওয়া। যাতে খামারিরা ন্যায্যমূল্য পান। তাহলে এ খাত আরো অনেক দূর এগিয়ে

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 7   +   3   =