রূপপুর বিদুৎকেন্দ্র ঝুঁকিতে

রাষ্ট্রীয় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে ঝুঁকিতে ফেলে কুষ্টিয়ার পদ্মা নদীতে চলছে বালু লুটের ভয়াবহ মহোৎসব। দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশে পদ্মা নদীতে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে প্রতিঘণ্টায় উত্তোলন করা হচ্ছে শতাধিক ট্রাক বালু। ভেড়ামারা উপজেলায় বাহিরচর ইউনিয়নে স্বশস্ত্র ক্যাডারদের প্রহরায় প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার ট্রাকে অর্ধকোটি টাকার বালু অন্যত্র পাচার করা হচ্ছে। সেই হিসাবে প্রতিমাসে বালু সিন্ডিকেটের পকেটে যাচ্ছে ১৫ কোটি টাকা।

মাত্র এক কিলোমিটারের মধ্যে থেকে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ ঝুঁকিতে পড়তে পারে ভেড়ামারা ৪১০ মেগাওয়াট আধুনিক কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র, দেশের বৃহত্তম গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প ও দেশের সর্ববৃহৎ রেল সেতু হার্ডিং ব্রিজ এবং লালন শাহ সেতু। জেলার রাজস্ব শাখা বলছে, কুষ্টিয়ার পদ্মা নদী থেকে বালু উত্তোলনের কোনো অনুমতি বা ইজারা নেই।

ভেড়ামারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, পদ্মা নদীতে কোনো বালু উত্তোলনের অনুমতি নেই। বালু উত্তোলনের সংবাদ পেলেই অভিযান পরিচালনা করা হয়। গত সোমবারও অভিযান চালিয়ে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইনচার্জ রুহুল কুদ্দুস বলেন, কেপিআই জোন এরিয়ায় বালু উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও হার্ডিং ব্রিজসহ একই অঞ্চলে তিনটি কেপিআই জোন অবস্থিত। নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে থেকে বালু উত্তোলন পার্শ্ববর্তী স্থাপনার জন্য ক্ষতিকর। তাই এসব স্থাপনার আশপাশে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষেধ। তবে সরেজমিন দেখে মনে হয়েছে, দেশের মধ্যে আরেক দেশ গড়ে তুলেছেন বালু খেকোরা। ওই অঞ্চলে তাদের কথায় শেষ কথা। প্রশাসনের লোক ও গণমাধ্যমকর্মী এসেছে বুঝতে পারলেই তাদের ওপর হামলা করা হয়। যার কারণে ওই অঞ্চলে ঢুকতে কেউ সাহস করে না।

উপজেলার বাহিরচর ইউনিয়নের পুরাতন ফেরিঘাট পয়েন্টে অন্তত ১০টি শক্তিশালী ড্রেজার মেশিন বসানো হয়েছে। সেখানে নদীর চরপড়া অংশ কেটে অবৈধভাবে ফিলিং বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। দিনে-রাতে ২৪ ঘণ্টায় প্রকাশ্যে শত শত ট্রাকে বালুভর্তি করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে ও তীরবর্তী এলাকায় মজুত করা হচ্ছে। স্থানীয়রা বলছেন, রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে বিভক্ত স্থানীয় বিএনপির একাধিক গ্রুপ বালু লুটে একত্র হয়েছেন। দ্বিতীয় সারির নেতা ও স্বশস্ত্র ক্যাডাররা বালু উত্তোলনে জড়িত থাকলেও বড় একটি অংশ যাচ্ছে শীর্ষ নেতাদের পকেটে। বালু লুটের এসব গল্প সবই জানেন প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা। তবে সব গ্রুপের শীর্ষ নেতারা জড়িত থাকায় বালু লুট বন্ধ করতে সাহস পাচ্ছে না স্থানীয় প্রশাসন।

পদ্মা নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলনের কথা স্বীকার করে উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব শাহজাহান আলী বলেন. পদ্মায় যারা অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে, তারা সবাই আহ্বায়কের লোকজন। এখানে আমার নিজের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম ডাবলু বলেন, যারা বালু তুলছে সবাই সরকারি দলের লোক। তাদের ঠেকানোর মতো ক্ষমতা আমাদের নেই। প্রশাসনকে বলেও কোনো কাজ হচ্ছে না। এভাবে বালু উত্তোলন হলে সরকারি স্থপনা ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে স্বীকার করেন এই নেতা। এদিকে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার আশপাশে এভাবে নদী কেটে বালু উত্তোলনের ফলে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে ভেড়ামারা উপজেলার বাহিরচর ইউনিয়নের পুরাতন ফেরিঘাট এলাকার যে পয়েন্টে অবৈধ বালু উত্তোলন করা হচ্ছে, তার মাত্র ৯০০ মিটারের মধ্যে অবস্থিত দেশের গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। আর মাত্র ৪০০ মিটারের মধ্যে রয়েছে ৪১০ মেগাওয়াট আধুনিক কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প। মাত্র ৬০০ মিটারের মধ্যে দেশের সর্ববৃহৎ রেল সেতু হার্ডিং ব্রিজ ও লালন শাহ সেতু। বালু উত্তোলনের কারণে পাশের কুষ্টিয়া-পাবনা মহাসড়কও রয়েছে ঝুঁকির মাঝে। অবৈধ বালু উত্তোলনে প্রতিবছর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার একর জমি।

গবেষক, উদ্ভাবক ও বিজ্ঞানী গৌতম কুমার রায় বলেন, অবৈধ ও অবাধ বালু নদী হতে তুলে নেওয়ার ফলে নদীর তলদেশে নোনা পানির প্রবাহ এগিয়ে আসে। এতে নদী ও নদীর তীরবর্তী পরিবেশ এবং অবকাঠামোগত ঝুঁকি বাড়ছে। ড্রেজারের বিকৃত খননের জন্য ভূগর্ভস্থ জল স্তরকে এগিয়ে আনে। এতে নদীর তলদেশে জলজ বাস্তুতন্ত্র নষ্ট হয়। নদী ভাঙনের গতি তীব্র হয়ে ওঠে। নদীর বায়োলজিক্যাল সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়ায়। ওই অঞ্চলে বালু উত্তোলনের কারণে ইউরেনিয়াম সংযুক্ত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র যে ঝুঁকিতে, তা আমাদেরকে যে কোনো সময় বড় ধরনের বিপর্যয়ে ফেলে দিতে পারে। বালু সিন্ডিকেটে রয়েছেন সাবেক এমপি অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম ও তার ভাই তৌহিদুল ইসলাম আলমের লোক হিসাবে পরিচিত উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জানবার হোসেন, পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম ডাবলু, বিএনপি নেতা জহুরুল ইসলাম বিজলি মালিথা, বাহিরচর ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সোহেল রানা ভুই বাবু। বিএনপির পরাজিত প্রার্থী রাগীব রউফ চৌধুরী ও শাহজাহান গ্রুপের নেতা পৌর যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ, আহ্বায়ক কমিটির সদস্য রফিকুল ইসলাম, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব এসএস আল হোসায়েন সোহাগ, সাবেক ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক আব্দুল হাই আল হাদী ওই সিন্ডিকেটের সদস্য।

সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য ফরিদা ইয়াসমিনের ভাই নজরুল ইসলাম নজু বলেন, হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বালু লুটপাট করা হচ্ছে। সংসদ সদস্যের সুনাম ক্ষুণ্ন করতে একটি মহল আমার নাম ব্যবহার করছে। তবে সাবেক সংসদ শহিদুল ইসলামের লোক হিসাবে পরিচিত উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জানবার হোসেন বলেন, আমরা এসবের সঙ্গে জড়িত না। আপনি ভেড়ামারা আসেন, সরাসরি কথা বলব। কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান বলেন, পদ্মা নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে জেলা প্রশাসন। নিয়মিত নদীতে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ইউএনওদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন ব্যর্থ হলে প্রয়োজনে জেলা থেকে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 3   +   4   =