টিটনের জীবন ও মৃত্যুর গল্প

গত মঙ্গলবার রাত পৌনে ৮টার দিকে নিউমার্কেটের পশ্চিম পাশে ঢাকা #বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ হলের সামনের বটতলায় তাকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায় দুর্বৃত্তরা। খুব কাছ থেকে তার মাথাসহ #শরীরের বিভিন্ন স্থানে পাঁচ থেকে ছয়টি গুলি করা হয়। #গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পথচারীরা তাকে উদ্ধার করে ঢাকা #মেডিকেল কলেজ #হাসপাতালে নিয়ে গেলে #চিকিৎসক রাত সাড়ে ৮টার দিকে তাকে #মৃত ঘোষণা করেন।
একসময় যার নাম শুনলে অনেকেই #আতঙ্কিত হতো, সেই টিটনের #জীবনের শেষ অধ্যায়ও শেষ হলো #সহিংসতার মধ্য দিয়েই।
নিহত টিটনের বাড়ি #যশোর শহরের খড়কী এলাকার আপনের মোড়। তার বাবা খন্দকার ফখরুদ্দিন #খুলনা জুট মিলের একজন উচ্চ পদস্থ #কর্মকর্তা ছিলেন। পারিবারিকভাবে #সচ্ছল পরিবারের সন্তান হয়েও টিটন অল্প বয়সেই জড়িয়ে পড়েন অপরাধ জগতের সঙ্গে। তার বাবা ফখরুদ্দিনের দুই #স্ত্রী ছিল।
তাদের সংসারে সাত ভাই ও পাঁচ বোন। সাত ভাইয়ের মধ্যে বড় ভাই রিপন ও তপন যশোরে বসবাস করেন। বাকিরা দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে আছেন। টিটন ছিলেন #চিরকুমার। পরিবারে #শিক্ষিত ও সচ্ছল পরিবেশ থাকলেও তার জীবন ধীরে ধীরে প্রবেশ করে অন্ধকার জগতে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নব্বইয়ের দশকের শুরুতেই টিটন ও তার ভাই টুটুল #রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অপরাধ জগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। সেই সময় থেকেই শুরু হয় তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। #চাঁদাবাজি, #আধিপত্য বিস্তার, #অস্ত্র ব্যবসা, #মাদক বাণিজ্য, #টেন্ডারবাজি, জমি #দখলসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়েন তারা। এলাকায় #ভয় ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করাই যেন ছিল তাদের শক্তি প্রদর্শনের প্রধান মাধ্যম। ধীরে ধীরে যশোর অঞ্চলে তাদের নাম হয়ে ওঠে আতঙ্কের প্রতীক। ১৯৯৯ সালে যশোরের কারবালা এলাকায় বিএনপির দুই কর্মী মোসলিম উদ্দিন খোকন ও টিপুকে হত্যার ঘটনায় টুটুলের নাম ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে টিটনের সংশ্লিষ্টতার কথাও বিভিন্ন সূত্রে উঠে আসে। ওই জোড়া হত্যাকাণ্ডের জেরে পরে র‍্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত হন টুটুল। ভাইয়ের মৃত্যুর পর টিটন যশোর ছেড়ে ঢাকায় চলে যান এবং সেখানে থেকেই অপরাধ জগতের নতুন অধ্যায় শুরু করেন। ঢাকায় গিয়ে তিনি ধীরে ধীরে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েন এবং নিজস্ব প্রভাব বলয় গড়ে তোলেন।
ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায় তাদের একটি বাড়িও ছিল। সেখান থেকেই তিনি দীর্ঘদিন ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। সূত্র মতে ঢাকার আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজেদুল ইসলাম ইমন ছিলেন টিটনের ভগ্নিপতি। তার সঙ্গেই থেকে টিটন অপরাধ জগতে আরও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা পান। খুন, অস্ত্র ব্যবসা, মাদক চোরাচালান, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, জমি ও বাড়ি দখলসহ অপরাধ জগতের প্রায় সব ক্ষেত্রেই ছিল তার সক্রিয় উপস্থিতি। বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে তিনি নিজের নেটওয়ার্ক আরও বিস্তৃত করেন।
২০০১ সালে তৎকালীন সরকার দেশের ২৩ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীর একটি তালিকা প্রকাশ করলে সেই তালিকার ২ নম্বরে ছিল নাইমুর হাসান টিটনের নাম। একই তালিকায় তার ভগ্নিপতি সাজেদুল ইসলাম ইমনের নামও ছিল। সেই সময় থেকেই তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির মধ্যে থাকলেও নানা কৌশলে নিজেকে আড়ালে রেখে অপরাধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতেন। একাধিকবার গ্রেপ্তার হলেও অপরাধ জগত থেকে পুরোপুরি সরে আসেননি।
সূত্র মতে তার অন্যতম বড় গোপন ব্যবসা ছিল অস্ত্র চোরাচালান। যশোর সীমান্ত ব্যবহার করে ভারত থেকে অস্ত্র এনে ঢাকায় বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের কাছে সরবরাহ করতেন তিনি। যশোর থেকে ঢাকা পর্যন্ত একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিলেন টিটন। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অস্ত্র ও মাদক দুই ধরনের অবৈধ ব্যবসাই পরিচালনা করা হতো। তার এই কর্মকাণ্ডের কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন তালিকায় দীর্ঘদিন ধরে তিনি ছিলেন আলোচিত ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি ঢাকার কারাগার থেকে মুক্তি পান। কারাগার থেকে বের হওয়ার পর অনেকেই ধারণা করেছিলেন হয়তো তিনি অপরাধ জগত থেকে নিজেকে দূরে রাখবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় তিনি আবারও পুরোনো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। গোপনে নিজের নেটওয়ার্ক সক্রিয় করতে শুরু করেন এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে যান।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই অন্ধকার পথই তাকে নিয়ে গেল করুণ পরিণতির দিকে। যে মানুষ একসময় ভয় ও আতঙ্কের প্রতীক ছিল, যে নাম শুনলে অনেকে পথ বদলে ফেলত, সেই টিটন শেষ পর্যন্ত নিজেও রক্ষা পেলেন না সহিংসতার নির্মম পরিণতি থেকে। ঢাকার ব্যস্ত এলাকায় প্রকাশ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে তার মৃত্যু যেন আবারও মনে করিয়ে দিল অপরাধের রাজনীতির শেষ পরিণতি কখনোই ভালো হয় না। সমাজের সচেতন মহল বলছে, এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল যে অপরাধের মাধ্যমে সাময়িক ক্ষমতা বা প্রভাব অর্জন করা গেলেও তার শেষ পরিণতি হয় করুণ ও নির্মম। চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, অস্ত্র ব্যবসা ও অপরাধের মাধ্যমে গড়ে ওঠা সাম্রাজ্য কখনো স্থায়ী হয় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে এবং ইতিহাস হয়ে যায় এক করুণ অধ্যায়ে। আজ অনেকেই বলছেন, যে পথ সহিংসতা দিয়ে শুরু হয় তার শেষও সহিংসতার মধ্যেই হয়। নাইমুর হাসান টিটনের জীবনের শেষ অধ্যায় যেন সেই বাস্তবতারই আরেকটি নির্মম উদাহরণ। যেই নলে উৎপত্তি, সেই নলেই বিনাশ। একসময় যিনি যশোর ও ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে ভয়ঙ্কর ডন হিসেবে পরিচিত ছিলেন, শেষ পর্যন্ত তিনিও সময়ের নির্মম বিচার থেকে রেহাই পেলেন না। এই টিটন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা থাকাকালে দীর্ঘদিন ছিলেন বন্দি কারাগারে তবুও নিজেকে একটিবারের জন্য পরিবর্তন করতে পারেননি টিটন। যশোরে তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকাজুড়ে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। কেউ বলছেন এটি অপরাধ জগতের স্বাভাবিক পরিণতি, আবার কেউ এটিকে দেখছেন দীর্ঘদিনের অন্ধকার জীবনের অবশ্যম্ভাবী সমাপ্তি হিসেবে। এই ঘটনা সমাজের জন্য একটি বড় শিক্ষা হয়ে থাকুক। কারণ ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, অপরাধের পথ যত শক্তিশালীই মনে হোক না কেন তার শেষ পরিণতি ধ্বংস ছাড়া আর কিছু নয়। অপরাধের সাম্রাজ্য যত বড়ই হোক, সময়ের কাছে একদিন তা ভেঙে পড়ে। আর সেই সত্যই আবারও নতুন করে প্রমাণ করল নাইমুর হাসান টিটনের জীবন ও মৃত্যুর গল্প।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 9   +   10   =