আয়নাঘর ও র‍্যাবের ভয়াল থাবা: একটি সাজানো সংসার ধ্বংসের নেপথ্যে কুখ্যাত আলেপ উদ্দিন

বিশেষ প্রতিবেদন ও অনুসন্ধান:

সোহেল হাওলাদার, নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক পূর্বাচল

প্রকাশের তারিখ: বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬

সময়: দুপুর ০১:০৫ (ঢাকা)

র‍্যাব কর্মকর্তা আলেপ উদ্দিনের পৈশাচিক নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হয়ে প্রাণ হারান এক নারী। আয়নাঘরের সেই লোমহর্ষক ঘটনার বিশেষ অনুসন্ধান।

ঢাকা: দাড়ি ও টুপি থাকার ‘অপরাধে’ এক নিরীহ যুবকের জীবন নরক বানিয়ে শান্ত হয়নি এলিট ফোর্স র‍্যাবের কতিপয় কর্মকর্তা। ক্ষমতা আর পাশবিক লালসার নির্মম শিকারে পরিণত করে কেড়ে নেওয়া হয়েছে তার স্ত্রীর সম্ভ্রম ও জীবন। র‍্যাব-১১-এর তৎকালীন কর্মকর্তা আলেপ উদ্দিনের পৈশাচিক নির্যাতন, ভয়ভীতি এবং ধারাবাহিক ধর্ষণের শিকার হয়ে অবশেষে ২০১৮ সালে ট্রমাটাইজড অবস্থায় এক বুক যন্ত্রণা নিয়ে মারা যান ওই ভুক্তনারী। অথচ এই ভয়াবহ অপরাধের মূল হোতা আলেপ উদ্দিন ও জিয়াউল আহসানের মতো কুখ্যাত কর্মকর্তারা বর্তমানে কারাগারে থেকেও বিশেষ সুবিধা ভোগ করছেন এবং জামিনে মুক্তির জন্য রাজনৈতিক লবিং চালাচ্ছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

গুমের সূচনা ও ভয়াবহ নির্যাতন

ঘটনার সূত্রপাত ঘটে যখন ওই ভুক্তভোগী ব্যক্তি অফিসের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হন। পথিমধ্যে র‍্যাবের একটি কালো গাড়ি তাকে তুলে নিয়ে যায় তথাকথিত ‘আয়নাঘরে’। সেখানে তাকে মিথ্যা জবানবন্দি দিতে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়। অন্যায় ও অপরাধের সাথে যুক্ত না থাকায় জবানবন্দি দিতে অস্বীকৃতি জানালে, তার ওপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন। ইলেকট্রিক শক, নখ উপড়ে ফেলাসহ দীর্ঘ ২৫ দিনের রিমান্ড শেষে তাকে জঙ্গি ও ব্যাংক ডাকাতির সম্পূর্ণ সাজানো মামলায় ২৩ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ভুক্তভোগীর অভিযোগ, স্রেফ দাড়ি-টুপি ও পাঞ্জাবি পরার কারণেই আয়নাঘরে তার ওপর নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।

মুক্তি, পুনরায় টার্গেট এবং পরিবারের ওপর আঘাত

২০১৮ সালে দীর্ঘ কারাবাস শেষে মুক্তি পেয়ে চাকরি হারানো এই ব্যক্তি যখন নতুন করে ব্যবসা গুছিয়ে মাথা গোঁজার চেষ্টা করছিলেন, ঠিক তখনই র‍্যাব তাকে দ্বিতীয়বার গুমের চেষ্টা করে। সুকৌশলে তিনি পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও, র‍্যাবের বিশেষায়িত দল তার স্ত্রী ও শ্যালককে জিম্মি করে তুলে নিয়ে যায়। স্ত্রীকে তিন দিন আটকে রেখে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও কুরুচিপূর্ণ ইঙ্গিত দেওয়া হয়। বাধ্য হয়ে স্ত্রীর সম্মান বাঁচাতে স্বামী আত্মসমর্পণ করলে তাকে পুনরায় র‍্যাব-১১-এর হেফাজতে নেওয়া হয়।

ক্ষমতার দাপটে ধারাবাহিক ধর্ষণ

স্বামী যখন আয়নাঘরে বন্দী, তখন তার স্ত্রীর ওপর নজর পড়ে র‍্যাব কর্মকর্তা আলেপ উদ্দিনের। প্রথমে ‘একাকীত্ব দূর করা’ এবং ‘স্বামীকে মুক্তির’ প্রলোভন দেখিয়ে কুপ্রস্তাব দেওয়া হয়। এতে রাজি না হওয়ায় মামলার নথিপত্র থেকে ঠিকানা সংগ্রহ করে ওই নারীর বাসায় জোরপূর্বক ঢুকে ধর্ষণের চেষ্টা চালায় আলেপ। সেদিন দায়িত্বরত নিরাপত্তা প্রহরীর তৎপরতায় রক্ষা পেলেও দমে যায়নি এই বাঘেরূপী হায়েনা।

পরবর্তীতে স্বামীকে ‘ক্রসফায়ার’ ও নতুন জঙ্গি মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে ইপিজেডের র‍্যাব অফিসার্স কোয়ার্টারে ডেকে নিয়ে প্রথমবার ওই নারীকে নির্মমভাবে ধর্ষণ করা হয়। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে চলে এই পাশবিকতা। এমনকি পবিত্র রমজান মাসে শবে কদরের রাতে বাপের বাড়ি থেকে জোরপূর্বক গাড়িতে তুলে নিয়ে এসে, জোর করে রোজা ভাঙিয়ে ওই নারীকে দ্বিতীয়বার ধর্ষণ করে আলেপ উদ্দিন।

সর্বশেষ, স্বামীর জামিনের কাগজপত্রের কথা বলে র‍্যাব অফিসে ডেকে এনে, স্বামীকে গেস্টরুমে বসিয়ে রেখে মাত্র ২০ মিনিটের ব্যবধানে ভেতরের কক্ষে আবার ওই নারীর ওপর পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়। বিধ্বস্ত ও রক্তাক্ত অবস্থায় বাড়ি ফিরে লোকলজ্জা ও ভয়ে প্রথমে চুপ থাকলেও, স্বামীর ক্রমাগত পিড়াপিড়িতে একপর্যায়ে অশ্রুসজল চোখে সব সত্য প্রকাশ করেন ওই অসহায় নারী।

ট্রমা এবং অবসান একটি জীবনের

এই ভয়াবহ মানসিক ও শারীরিক ট্রমা সহ্য করতে পারেননি ওই গৃহবধূ। জায়নামাজে বসে অবিরত কান্নাকাটি, খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং মানসিকভাবে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে একপর্যায়ে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই ২০১৮ সালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি। মৃত্যুর আগে স্বামীর কাছে আকুতি জানিয়ে গিয়েছিলেন এই রাষ্ট্রীয় বর্বরতার বিচার নিশ্চিত করতে।

কারাগারে ভিআইপি সুবিধা ও নেপথ্যের আঁতাত

একটি সুন্দর ও হাসিখুশি সংসার ধ্বংসের কারিগর আলেপ উদ্দিন বর্তমানে কারাগারে থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, সে সেখানে বিশেষ সেলে রাজকীয় হালে রয়েছে। আদালতে আনা-নেওয়ার জন্য তাদের এসি বাসের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। দেশের মানুষ যখন খেলাধুলা বা ভিন্ন ইস্যুতে মগ্ন, ঠিক সেই সুযোগে বিপুল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক নেতার সাথে সমঝোতা করে জামিনে বের হওয়ার জোর চেষ্টা চালাচ্ছে এই কুখ্যাত কর্মকর্তা।

আইনের রক্ষক হয়ে ভক্ষকের ভূমিকা পালনকারী এই কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং স্ত্রীর মৃত্যুর পূর্বে রেখে যাওয়া শেষ ইচ্ছার বিচার চেয়ে দেশের মানবাধিকার সংস্থা ও প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন অসহায় স্বামী।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 10   +   7   =