সব্যসাচী অভিনেতা শওকত আকবরকে শ্রদ্ধাঞ্জলি

বিনোদন ডেস্ক:

বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি ও সব্যসাচী অভিনেতা শওকত আকবরের মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা। ঢাকা মেডিকেল ছেড়ে অভিনয়ে আসা এই গুণী শিল্পীর জীবন ও ক্যারিয়ারের বিস্তারিত

বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী অধ্যায়ের অন্যতম কাণ্ডারি ও সব্যসাচী অভিনেতা শওকত আকবরের মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। ১৯৬৩ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত সুদীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রে নিজের অভিনয় দক্ষতার এক অবিস্মরণীয় ছাপ রেখে গেছেন এই কিংবদন্তি।

মঞ্চ থেকে রূপালি পর্দা: এক বর্ণিল ক্যারিয়ার

১৯৩৭ সালের ৭ মার্চ পশ্চিমবঙ্গের হুগলিতে জন্ম নেওয়া শওকত আকবরের শৈশব ও স্কুলজীবন কেটেছে সেখানেই। তাঁর পিতা ছিলেন হুগলি ইসলামিক কলেজের প্রভাষক। স্কুলজীবন থেকেই সিনেমার প্রতি গভীর অনুরাগ জন্মে তাঁর, যার ফলশ্রুতিতে যুক্ত হন মঞ্চনাটকে। তাঁর অভিনীত প্রথম মঞ্চনাটক ছিল শরৎচন্দ্রের বিখ্যাত ‘দেবদাস’।

১৯৫০ সালে দাঙ্গার কারণে পরিবারের সাথে তৎকালীন পূর্ব বাংলা (ঢাকায়) চলে আসেন তিনি। ১৯৫২ সালে ম্যাট্রিক পাসের পর ১৯৫৩ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে এলএমএফ কোর্সে ভর্তি হন। তবে চিকিৎসা শাস্ত্রের পড়াশোনা শেষ করলেও নাড়ির টান এড়াতে পারেননি; শেষ পর্যন্ত অভিনয়কেই জীবনের ধ্যান-জ্ঞান হিসেবে বেছে নেন।

১৯৬৪ সালে ‘এইতো জীবন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাঁর রূপালি পর্দায় অভিষেক ঘটে। তিনি একাধারে নায়ক এবং সহ-অভিনেতা হিসেবে সফল ছিলেন। তবে সহ-অভিনেতা বা চরিত্রাভিনেতা হিসেবেই তিনি দর্শকহৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন তৈরি করে নেন। ‘ভাওয়াল সন্ন্যাসী’, ‘অপরিচিতা’, ‘অভিশাপ’ ও ‘আলোর পিপাসা’র মতো চলচ্চিত্রে তিনি একক নায়ক হিসেবে অভিনয় করেন। এর মধ্যে ‘আলোর পিপাসা’ ছবিতে পশ্চিম পাকিস্তানের তৎকালীন লাস্যময়ী অভিনেত্রী রুখসানার বিপরীতে তাঁর অভিনয় বেশ প্রশংসিত হয়।

বিশেষ করে ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ ছবিতে তাঁর রাজকীয় ‘রাজা’র চরিত্রটি আজও কোটি বাঙালির মনে দাগ কেটে আছে।

কালজয়ী সৃষ্টি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

সুদীর্ঘ ক্যারিয়ারে শওকত আকবর প্রায় আড়াইশ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য বাংলা ছবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— সুতরাং, জীবন থেকে নেয়া, হাঙর নদী গ্রেনেড, ছুটির ঘণ্টা, অবুঝ মন, শঙ্খমালা, টাকা আনা পাই, মোমের আলো, তালাশ, আগুন নিয়ে খেলা, ফকির মজনু শাহ, কুয়াশা প্রভৃতি।

উর্দু চলচ্চিত্রেও তিনি ছিলেন সমান জনপ্রিয়। দিল এক শিশা, পু নম কি রাত, ওয়েটিং রুম, চলো মান গায়ে, আখেরি স্টেশন, শরীফে হায়াত ইত্যাদি উর্দু ছবিতে তিনি অভিনয় করেন। এর মধ্যে ‘ভাইয়া’ চলচ্চিত্রে দুর্দান্ত অভিনয়ের জন্য তিনি পাকিস্তানের মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক ‘নিগার পুরস্কার’ (সেরা পার্শ্ব অভিনেতা) লাভ করেন। অভিনয়ের পাশাপাশি ‘বিমান বালা’ নামে একটি চলচ্চিত্র পরিচালনাও করেছিলেন তিনি, যদিও তা পরবর্তীতে মুক্তি পায়নি।

পারিবারিক ট্র্যাজেডি ও জীবনের শেষ অধ্যায়

ব্যক্তিগত জীবনে শওকত আকবরের সহধর্মিণী মুক্তা আকবরও বিয়ের আগে অভিনয়ের সাথে যুক্ত ছিলেন। এই দম্পতির ঘরে জন্ম নেয় দুই ছেলে (মিল্টন ও লিংকন) এবং এক মেয়ে (এ্যানি)। ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার সময় একটি হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডি ঘটে তাঁর জীবনে। বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করতে গিয়ে পানিতে ডুবে মারা যান তাঁর ছোট ছেলে। এই অকাল মৃত্যুতে মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েন শওকত আকবর।

পরবর্তীতে তিনি যুক্তরাজ্যে (লন্ডন) বড় ছেলের কাছে চলে যান এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ২০০০ সালের ২৩ জুন লন্ডনেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি অভিনেতা। প্রবাসের মাটিতেই চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন বাংলা চলচ্চিত্রের এই উজ্জ্বল নক্ষত্র।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 3   +   10   =