রাজধানীর বেসরকারি আবাসিক প্রকল্প বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ২২২ বিঘা সরকারি জমি চিহ্নিত করেছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কাছ থেকে প্রকল্প অনুমোদনের নথিপত্র যাচাই শেষে ৩ হাজার ৩১৪ দশমিক ৮৯ একর জমির অনুমোদনের প্রমাণ পেয়েছে সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু বাস্তবে বাড্ডা, ভাটারা, খিলখেত ও ক্যান্টনমেন্ট থানার মোট ৯টি মৌজায় ৩ হাজার ৪০৪ দশমিক ৪০ একর জমি বসুন্ধরার মালিকানাধীন ইস্ট ওয়েস্ট প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে। ফলে ৭৪ দশমিক ১৮ একরকে সরকারি স্বার্থ সংশ্লিষ্ট জমি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গত ৫ মে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সারসংক্ষেপে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় সরকারি জমি চিহ্নিত হওয়ার বিষয়টি গত ৫ মে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। চিঠিতে লেখা হয়েছে, বিষয়টির লিখিত সারসংক্ষেপ গণপূর্ত মন্ত্রী দেখেছেন এবং মন্ত্রী-সভা বৈঠকে উপস্থাপনের জন্য সম্মতি দিয়েছেন।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতাভুক্ত করতে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে একটি অনুশাসন দেওয়া হয়। এরপর মন্ত্রণালয় ও রাজউকের একটি দল মিলে বিস্তারিত তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে চিঠি আকারে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠায়। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় প্লট-ফ্ল্যাট হস্তান্তরে ইস্ট ওয়েস্ট প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট প্রাইভেট লিমিটেডের পক্ষ থেকে যে ফি আদায় করা হয়, তা বাতিলে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে আগামী সোমবার (১১ মে) সভা ডাকা হয়েছে।
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা এমনিতেই ডিএনসিসির অধীনে রয়েছে। খাস জমি উদ্ধার শুধু বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায়ই নয়, সারা দেশেই উদ্ধার করা হবে। যা হবে, সব আইনগতভাবেই হবে। চিঠিতে আরও বলা হয়, ইস্ট ওয়েস্ট প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার উদ্যোক্তা কোম্পানী সর্বশেষ ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই তাদের প্রকল্পের ম্যাপ ও জিআইএস ডাটাবেস গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়।
জমাকৃত সেই ম্যাপ ও ডাটাবেস অনুযায়ী ঢাকা জেলার ভাটারা, বাড্ডা, খিলক্ষেত, ক্যান্টনমেন্ট থানাধীন ভাটারা, কাঠালদিয়া, ডুমুনী পাতিরা, বড় বেরাইদ, ছোট বেরাইদ, সাতারকুল, জোয়ারসাহারা ও বড়ুয়া মৌজায় তাদের মোট জমির পরিমান ১০ হাজার ২১৩ বিঘার চেয়ে কিছু বেশি। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ২২২ বিঘা জমি সরকারের।
সারসংক্ষেপে আরও বলা হয়, ১৯৮৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর কিছু শর্তসাপেক্ষে ইস্ট ওয়েস্ট প্রপার্টি ডেভেলপমেন্টকে বসুন্ধরা আবাসিক প্রকল্পের লে-আউট প্ল্যান অনুমোদন দিয়েছিল রাজউক। পরে ২০১৬ সালের ২১ জানুয়ারি প্রায় ৯ হাজার ৯০৫ বিঘা জমির (সরকারি জমি বাদে) ওপর বসুন্ধরা আবাসিক প্রকল্পের জন্য ইস্ট ওয়েস্ট প্রপার্টি ডেভেলপমেন্টকে লে-আউট প্ল্যান শর্তসাপেক্ষে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল সাংবাদিকদের বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় থাকা খাস জমি উদ্ধার এবং ডিএনসিসির আওতায় আনার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা এমনিতেই ডিএনসিসির অধীনে রয়েছে। খাস জমি উদ্ধার শুধু বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায়ই নয়, সারা দেশেই উদ্ধার করা হবে। যা হবে, সব আইনগতভাবেই হবে।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে এ বিষয়ে বসুন্ধরা আবাসিক প্রকল্পের উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান ইস্ট ওয়েস্ট প্রপার্টি ডেভেলপমেন্টকে চিঠি দিয়েছে। এ বছরের ১৬ এপ্রিল বেসরকারি আবাসিক প্রকল্পের ভূমি উন্নয়ন বিধিমালা ২০০৪ (সংশোধিত ২০১২ ও ২০১৫)-এর আলোকে বসুন্ধরা আবাসিক প্রকল্পের অনুমোদিত লে আউটে অবস্থিত সকল নাগরিক সুবিধাদির জন্য চিহ্নিত সংরক্ষিত জমি দ্রুত ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তর করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব আরও বলেন, অনেক জায়গা-জমি অবৈধ দখলে রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে এ নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা চলমান রয়েছে। এসব কিছুই আইনগতভাবে দেখছে সরকার। এদিকে, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই সেখানকার বাসিন্দারা সব ধরনের আধুনিক নাগরিক সুযোগ-সুবিধা পেয়ে আসলেও ; ওয়েলফারে সোসাইটির নামে বিভিন্ন সার্ভিস চার্জ নিয়ে বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ছিল। এবার নতুন সরকার গঠনের পর আবাসিক এলাকাটি ডিএনসিসির অধীভুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এরই মধ্যে বসুন্ধরা আবসিক এলাকাটি ডিএনসিসিকে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের চিঠি দেওয়া হয়েছে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার অভ্যন্তরে উন্নয়নকৃত রাস্তাঘাটসহ অন্যান্য নাগরিক সুবিধাদি রাজউকের অনুমোদিত লে আউট নকশা সিডিউলসহ দালিলিক কাগজপত্র হস্তান্তর সংক্রান্ত অফিস আদেশ জারি করা হয়েছে।’
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে এ বিষয়ে বসুন্ধরা আবাসিক প্রকল্পের উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান ইস্ট ওয়েস্ট প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডকে চিঠি দিয়েছে। গত ১৬ এপ্রিল বেসরকারি আবাসিক প্রকল্পের ভূমি উন্নয়ন বিধিমালা ২০০৪ (সংশোধিত ২০১২ ও ২০১৫)-এর আলোকে বসুন্ধরা আবাসিক প্রকল্পের অনুমোদিত লে আউটে অবস্থিত সকল নাগরিক সুবিধাদির জন্য চিহ্নিত সংরক্ষিত জমি দ্রুত ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তর করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা আগে ছিল ভাটারা, বেরাইদ ও ডুমনি নামের তিনটি ইউনিয়ন পরিষদের আওতায়। ভাটারা ইউনিয়নের জোয়ার সাহারা ও ভাটারা, বেরাইদের বড় বেরাইদ আর ডুমনির ডুমনি, বড় কাঠালদিয়া ও পাতিরা মৌজা এখন থেকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সীমানাভুক্ত করা হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘বিধি অনুযায়ী স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীন স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক সকল প্রকারের সেবা ও কর আদায়সহ অন্যান্য প্রশাসনিক যেকোনো কার্যক্রম গ্রহণে আইনগত কোনো বাধা নেই। প্রস্তাবটি রাষ্ট্রের প্রচলিত আইন অনুযায়ী মন্ত্রীসভার নীতিগত অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হচ্ছে।’
জানা যায়, ২০টি ব্লকে ভাগ করা বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় এই মুহূর্তে ৩৫ হাজারের বেশি প্লট আছে। এই আবাসিক এলাকায় বেশ কয়েকটি নামকরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও আছে। বাংলা ও ইংলিশ মিডিয়ামসহ শিশুদের শিক্ষার জন্যও স্কুলও আছে। পরিকল্পিত শহর হিসেবে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাকে গড়ে তোলার কথা ছিল। ১৯৮৭ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্প এখন ভূমিদস্যু হিসেবে পরিচিত বসুন্ধরা গ্রূপের টাকা কামানোর “মেশিন” হিসেবে পরিচিত।
গ্যাস সিলিন্ডার, ইট,বালু, বিটুমিন সবই বসুন্ধরার থেকে কিনতে বাধ্য করা হয় বাসিন্দাদের। এব্যাপারে সালাউদ্দিন রিগান নামের একজনের লেখা ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়াতে ভাইরাল হয়েছে।
তিনি লিখেছেন,”বসুন্ধরাকে দেশের ভিতরে আরেকটা দেশ বলা যায়। আপনি এখান থেকে আপনার মালামাল বের করবেন, তার অনুমতি লাগবে, নিজের মালামাল ঢুকাবেন , তারও অনুমতি লাগবে। আপনি আপনার প্লট বেচবেন, কাঠা প্রতি ৫ লাখ তাকে দিতে হবে, আপনি নিজের জমি নিজে ডেভেলপমেন্ট করবেন, কাঠাপ্রতি ৫ লাখ তাদের দিতে হবে, আপনার জমি কোন কোম্পানিকে ডেভেলপমেন্ট করতে দিবেন, কাঠাপ্রতি ১০ লাখ ঐ কোম্পানি থেকে চাদা নিবে। আপনি আপনার ল্যান্ডের মাটি কাটবেন? তাদের নির্ধারিত লোককেই এই কাজ দিতে হবে, মার্কেট রেট আছে ৬ টাকা তাদের লোককে দিতে হবে ১৮ টাকা।
আপনার ল্যান্ডের মাটি আবার তাদের নির্ধারিত জায়গায় ফেলতে হবে, বসুন্ধরার বাহিরেও নেওয়া যাবে না। ট্রাক ভাড়াও আপনাকে বহন করতে হবে। আপনার রাবিশ ফেলবেন তাদের লোকদের দিয়েই ফেলতে হবে। ২০০০/- প্রতি ট্রাক। ট্রাক ড্রাইভারদের আবার ঘুস না দিলে তারা আপনার রাবিশ নিবে না। আপনি রেডিমিক্স ঢালাই করবেন? তাদের রেডিমিক্স নিতে হবে, মার্কেট রেট ৩৪০/- তাদের রেট ৩৯০/- ; তাই কেনো আপনি সিটি কর্পোরেশন এর বাহিরে থাকবেন?

