অভিনেতা মিঠুন: রূপালি পর্দা থেকে সাহিত্য

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু শিল্পীর নাম রয়েছে, যারা শুধুমাত্র অভিনয় নয়, জ্ঞান, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে নিজেদের আলাদা পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁদেরই একজন ছিলেন শেখ আবুল কাশেম মিঠুন—সংক্ষেপে মিঠুন নামে পরিচিত।

১৯৮০ সালে ‘তরুলতা’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রূপালি পর্দায় তাঁর অভিষেক ঘটে। ছবিটিতে তাঁর সহনায়িকা ছিলেন নবাগতা মিন্না খান এবং লাস্যময়ী সুনীতা। শুরু থেকেই তাঁর অভিনয়ে ছিল স্বতন্ত্রতা, যা দ্রুতই দর্শকের নজর কাড়ে।

বাংলা চলচ্চিত্রে উচ্চশিক্ষিত অভিনেতাদের মধ্যে মিঠুন ছিলেন অন্যতম। তাঁর মেধা ও ব্যক্তিত্বের প্রতি আস্থা রেখেছিলেন কিংবদন্তি অভিনেতা নায়করাজ রাজ্জাক। তাঁরই পরিচালনায় নির্মিত ‘বাবা কেন চাকর’ ছবিতে মিঠুন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। পাশাপাশি বরেণ্য চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব রহমান তাঁকে তাঁর ‘নিকাহ’ ছবিতে প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ দেন।

১৯৫১ সালের ১৮ এপ্রিল সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলার দরগাহপুর গ্রামের এক ঐতিহ্যবাহী শেখ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পিতা ছিলেন মরহুম শেখ আবুল হোসেন এবং মাতা হাফেজা খাতুন।

শিক্ষাজীবনেও তিনি ছিলেন কৃতিত্বের স্বাক্ষর। ১৯৭২ সালে পাইকগাছা উপজেলার রাড়ুলির আর কে বি কে এইচ সি ইনস্টিটিউট থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর খুলনা সিটি কলেজ থেকে ১৯৭৪ সালে এইচএসসি সম্পন্ন করে একই কলেজে বিএসসিতে ভর্তি হন। পরবর্তীতে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি তিনি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭৮ সালে নূর মোহাম্মদ টেনা সম্পাদিত ‘সাপ্তাহিক কালান্তর’ পত্রিকায় লেখালেখির মাধ্যমে সাংবাদিকতায় পথচলা শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি ওই পত্রিকার কার্যনির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও বাংলাদেশ বেতার খুলনা কেন্দ্রের স্ক্রিপ্ট রাইটার ও গীতিকার হিসেবেও কাজ করেছেন।

চলচ্চিত্রজীবনে তিনি অসংখ্য জনপ্রিয় সিনেমায় অভিনয় করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—‘ঈদ মোবারক’, ‘ভেজা চোখ’, ‘নিকাহ’, ‘কুসুমকলি’, ‘প্রেম প্রতিজ্ঞা’, ‘বেদের মেয়ে জোছনা’, ‘স্বর্গনরক’, ‘ত্যাগ’, ‘চ্যালেঞ্জ’, ‘গৃহলক্ষ্মী’, ‘খোঁজ-খবর’, ‘ছোবল’, ‘কসম’, ‘দিদার’, ‘মাসুম’, ‘দস্যু রাণী ফুলন দেবী’, ‘জেলহাজত’, ‘অন্ধবধূ’, ‘চন্দনা ডাকু’, ‘স্যারেন্ডার’ এবং ‘বাবা কেন চাকর’ প্রভৃতি। নায়ক চরিত্রের পাশাপাশি তিনি পার্শ্ব চরিত্রেও সমান দক্ষতার সঙ্গে অভিনয় করেছেন। এছাড়াও তিনি বহু চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচনায় অবদান রাখেন।

দীর্ঘ কর্মময় জীবনের পর ২০১৫ সালের ২৪ মে শারীরিক জটিলতায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় কলকাতার একটি হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পরবর্তীতে তাঁর মরদেহ দেশে এনে দাফন করা হয়।

বাংলা চলচ্চিত্র, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে তাঁর অবদান আজও স্মরণীয় হয়ে রয়েছে। বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী এই শিল্পী তাঁর কর্মের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকবেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

ডেইলি পূর্বাচল তাঁর প্রতি জানায় গভীর শ্রদ্ধা।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 9   +   6   =