APORAD

টেকনাফ পাহাড়ে মানব পাচারের ভয়ংকর আস্তানা: যৌথ বাহিনীর অভিযানে মুক্ত ৫৬, নেপথ্যে সাদ্দাম ও আলম গ্রুপ

কক্সবাজার প্রতিনিধি, ডেইলি পূর্বাচল:

উন্নত জীবনের আশায় ঘর ছেড়েছিলেন চট্টগ্রামের বাঁশখালীর মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর। কিন্তু কর্মসংস্থানের লোভ দেখিয়ে এক দালালের মাধ্যমে তাকে মাত্র ১ লাখ টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হয় মানব পাচারকারীদের কাছে। ঠাঁই হয় টেকনাফের দুর্গম পাহাড়ের এক অন্ধকার ঝুপড়িতে। লোহার শিকলে বন্দি জাহাঙ্গীর সেখানে পাচারকারীদের নির্মম নির্যাতন আর অনাহারের শিকার হন। কেবল জাহাঙ্গীর নন, তার মতো আরও অনেকেই সেখানে বন্দি ছিলেন। অবশেষে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের রঙ্গিখালী পাহাড়ে যৌথ বাহিনীর এক শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে অবসান ঘটে এই নরকযন্ত্রণার।
গত বৃহস্পতিবার পরিচালিত এই বিশেষ অভিযানে জাহাঙ্গীরসহ ৫৬ জন দেশি-বিদেশি নাগরিককে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তবে এই উদ্ধার অভিযান চালাতে গিয়ে অপরাধীদের গুলিতে তিতাস শেখ নামে যৌথ বাহিনীর এক বীর সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। ঘটনাস্থল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৬ সন্দেহভাজন পাচারকারীকে।
শিকলবন্দি জীবনের লোমহর্ষক বর্ণনা
উদ্ধার পাওয়া জাহাঙ্গীর জানান, বন্দিশালায় প্রতিদিন ৪-৫ জন করে নতুন মানুষ ধরে আনা হতো। সামান্য ডাল আর লাউয়ের তরকারি দিয়ে দিনে মাত্র দুবার খাবার দেওয়া হতো। টাকা ও মালয়েশিয়া পাঠানোর নাম করে বন্দিদের ওপর চালানো হতো মধ্যযুগীয় বর্বরতা। এর আগে বহু মানুষকে নির্যাতন করে ট্রলারে তুলে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচার করেছে এই চক্রটি। প্রায় ১০২ জন রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি নাগরিক জিম্মি থাকার গোপন তথ্যের ভিত্তিতে এই সফল অভিযান চালায় যৌথ বাহিনী।
অপরাধীদের হাতে মিয়ানমার সংঘাতের ভারী অস্ত্র
অভিযানে অংশ নেওয়া নিরাপত্তা বাহিনীর এক সদস্য জানিয়েছেন, দুর্গম পাহাড়ের এসব অপরাধী চক্রের কাছে অত্যন্ত আধুনিক ও ভারী অস্ত্র রয়েছে। উদ্ধার অভিযানের সময় সন্ত্রাসীরা প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে যৌথ বাহিনীকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করে। ধারণা করা হচ্ছে, তাদের কাছে ‘জি-থ্রি’ রাইফেলের মতো সামরিক গ্রেডের অস্ত্র রয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে দেশীয় বন্দুক ও চার রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। স্থানীয়দের মতে, মিয়ানমারের রাখাইনে আরকান আর্মি ও জান্তা বাহিনীর সংঘাতের সময় সীমান্ত গলে আসা বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক অস্ত্র রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাধ্যমে এই অপরাধীদের হাতে পৌঁছেছে।
ক্যাম্প নিয়ন্ত্রণে ভয়ংকর ‘সাদ্দাম’ ও ‘আলম’ গ্রুপ
অনুসন্ধানে জানা গেছে, টেকনাফের লেদা, জাদিমুড়া, শালবাগান ও নোয়াপাড়া রেজিস্টার্ড রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় গত সাত বছর ধরে অন্তত ১০টি সশস্ত্র গ্রুপ আধিপত্য বিস্তার করে আসছে। এর মধ্যে আরসা, আরএসও, এআরএ-এর পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে সাদ্দাম গ্রুপ ও আলম গ্রুপ বর্তমানে সবচেয়ে বেশি মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ক্যাম্পের সাধারণ রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন, এই দুই রোহিঙ্গা দলনেতার অনুমতি ছাড়া ক্যাম্পে কারও কিছু করার সাধ্য নেই। অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, মাদক ও মানব পাচারের পুরো সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে তারা। এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা দিন দিন মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে এবং স্থানীয় কিশোর-তরুণদের অপরাধ জগতে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বাড়ছে।
১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক ও অতিরিক্ত ডিআইজি কাউসার সিকদার জানান, পাহাড়ে অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। গত কয়েক মাসে ব্যাপক অভিযান চালিয়ে বহু সন্ত্রাসী ও পাচারকারীকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে এবং এই চিরুনি অভিযান অব্যাহত থাকবে।
টেকনাফ অঞ্চলের অপরাধ সিন্ডিকেট ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির সবশেষ আপডেট জানতে চোখ রাখুন ‘ডেইলি পূর্বাচল’-এর পাতায়।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment