স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক পূর্বাচল | প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬
আঁকাবাঁকা সরু গলি আর প্রচণ্ড স্থান সংকট—প্রতিদিন যেখানে বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবী মিলে ভিড় জমান অন্তত ৫০ হাজারের বেশি মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে জজকোর্ট প্রাঙ্গণে নেই পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা, পানীয় জল কিংবা মৌলিক নাগরিক সুবিধা। চরম দুর্ভোগ আর দিশেহারা পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে এবার বড় ধরনের মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে মাঠে নেমেছে সরকার। বদলে যাচ্ছে দেশের প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্র ও নিম্ন আদালতের ঠিকানা।
সরকারের নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাজধানীর নবাব আবদুল গণি রোডের বর্তমান সচিবালয় প্রাঙ্গণে সরিয়ে নেওয়া হবে পুরান ঢাকার নিম্ন আদালত (অধস্তন আদালত)। আর নতুন সচিবালয় গড়ে তোলা হবে ঢাকার শেরেবাংলা নগরের পুরনো বাণিজ্য মেলার মাঠ প্রাঙ্গণে।
শেরেবাংলা নগরে ২৪ একরের ওপর নতুন সচিবালয়
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৪০৯ কোটি ৪৪ লাখ ২৯ হাজার টাকা। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন গণপূর্ত অধিদপ্তর শেরেবাংলা নগরের পুরনো বাণিজ্য মেলা মাঠে ২৪ একর জমির ওপর নতুন সচিবালয় ভবনের লে-আউট (নকশা) তৈরি করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত নকশাটি পছন্দ করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ‘সবুজ পাতায়’ অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন সরকারপ্রধান। আগামী ২০২৬ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
দাপ্তরিক প্রক্রিয়া ও একনেক অনুমোদন
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রকল্পটি অনুমোদনের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং আইন মন্ত্রণালয়। খুব শিগগিরই এটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় পেশ করা হবে।
ইতিমধ্যেই গণপূর্ত অধিদপ্তর প্রস্তাবিত ‘ঢাকার শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ সচিবালয় স্থাপন’ শীর্ষক প্রকল্পের প্রয়োজনীয় নথিপত্র পরিকল্পনা কমিশনে জমা দিয়েছে। পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখা-৩-এর উপসচিব রুবায়েত হায়াত শিপলু স্বাক্ষরিত চিঠিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে অননুমোদিত নতুন প্রকল্প তালিকায় এটি অন্তর্ভুক্তির অনুরোধ জানানো হয়েছে।
পুরান ঢাকার আদালতপাড়ার বর্তমান চিত্র
অনুসন্ধানে জানা যায়, পুরান ঢাকার বর্তমান আদালতপাড়ায় ১১৮টি আদালত রয়েছে। যেখানে আনুমানিক সাড়ে ৪ লাখ ফৌজদারি এবং দেড় লাখ দেওয়ানি মামলা বিচারপ্রক্রিয়াধীন।
- এজলাস সংকট: পর্যাপ্ত স্থান না থাকায় বেশ কয়েকটি আদালতকে এজলাস ভাগাভাগি করে বিচারকাজ চালাতে হয়।
- অবকাঠামোগত ঘাটতি: সেরেস্তা, নকলখানা, রেকর্ডরুম এবং পর্যাপ্ত লিফট না থাকায় তীব্র ভোগান্তি পোয়াতে হয়।
- নাগরিক সুবিধার অভাব: বসার জায়গা, বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ, শৌচাগার এবং গাড়ি পার্কিংয়ের তীব্র ঘাটতি রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের প্রতিক্রিয়া
প্রকল্পটিকে স্বাগত জানিয়ে ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আনোয়ার জাহিদ ভূঁইয়া দৈনিক পূর্বাচল-কে বলেন, “সংকীর্ণ এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় পুরান ঢাকায় প্রয়োজনীয় সুবিধা যুক্ত করা যাচ্ছে না। বিচারকাজে গতি আনতে এবং ভোগান্তি কমাতে জজকোর্ট সচিবালয়ের সুবিশাল এলাকায় স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত ইতিবাচক। এটি বাস্তবায়িত হলে আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থী উভয়ই সুফল পাবেন।”
আদালতে আসা কাজী হায়দার আলী নামে এক বিচারপ্রার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এজলাসে আইনজীবীরা বসার জায়গা পেলেও বিচারপ্রার্থীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে বা বারান্দায় বসে থাকতে হয়। স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়ন হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে।”
সব প্রক্রিয়া শেষে প্রকল্পটির কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলে রাজধানী ঢাকার যানজট ও প্রশাসনিক সক্ষমতায় এক আমূল পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।


