নিজস্ব প্রতিবেদক, পূর্বাচল:
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযান ও গ্রেপ্তার সত্ত্বেও কুমকুমিল্লায় থামছে না কিশোর গ্যাংয়ের বেপরোয়া তৎপরতা। মারামারি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ও অস্ত্র বহনসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে এসব গ্রুপের সদস্যরা। সর্বশেষ সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের ভয়াবহতা ও সক্রিয়তা নিয়ে নতুন করে তীব্র আলোচনা ও উদ্বেগ শুরু হয়েছে। অলিগলি থেকে শুরু করে পাহাড়ঘেরা এলাকা—সবখানেই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অর্ধশতাধিক কিশোর গ্যাং।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড ও দেশজুড়ে চাঞ্চল্য
নিহত ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান। গত ১৮ সেপ্টেম্বর মায়ের আইফোন নিয়ে ছবি তোলার জন্য ঘর থেকে বের হয়ে সে নিখোঁজ হয়। পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার একটি জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই লোমহর্ষক ঘটনায় ইতোমধ্যে ডিবি পুলিশ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং উদ্ধার করা হয়েছে অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোনটি। এর আগে, গত ২০ সেপ্টেম্বর অপ্রতিম হত্যার বিচার দাবিতে কুমিল্লায় মহাসড়ক অবরোধ করেন স্থানীয় শিক্ষার্থীরা ও এলাকাবাসী।
অর্ধশতাধিক নামে সক্রিয় অপরাধী চক্র
স্থানীয় সূত্র ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সাল থেকে কুমিল্লা মহানগর ও আশপাশের এলাকায় বিভিন্ন কিশোর গ্রুপের তৎপরতা শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব গ্রুপের অপরাধের পরিধিও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। দলবদ্ধভাবে চলাফেরা, মোটরসাইকেল নিয়ে শোডাউন এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তার স্থানীয়দের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
এলাকাভেদে ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত এসব গ্যাংয়ের মধ্যে রয়েছে:
-
ঈগল গ্রুপ, রতন গ্রুপ ও আর স্কোয়াড
-
র্যাক্স, এক্স, এলআরএন ও সিবিক
-
মডার্ন, রকস্টার, ডিস্কো বয়েজ ও বস
-
রয়েল বেঙ্গল, সিজলিন, জে অ্যান্ড জে ও বিগ ব্রাদার
-
টুইস্ট, ব্ল্যাক স্টার, ডার্ক ও আরজিএস
-
সিএমসি, কিং স্কোয়াড ও ক্রাইম সেটআপ
বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তে জানা যায়, ২০১৬ সাল থেকে চলতি বছরের ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের হাতে মোট ১৪টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০২২ সালের ১৯ আগস্ট মো. শাহাদাত হোসেন (১৫) এবং ৩১ ডিসেম্বর ফয়সাল ইসলাম হৃদয় (১৮) খুন হন। এছাড়া ২০২৪ সালের ৪ ডিসেম্বর সজীব হোসেন ওরফে বাবু (২২) নামের এক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যার পেছনেও কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়।
পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান ও ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করেছে পুলিশ। জেলা পুলিশের তথ্যমতে, গত ১৫ দিনে পাঁচ শতাধিক কিশোর গ্যাং সদস্যকে আটক করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, মাদক ও কিশোর গ্যাং দমনে পুলিশ কঠোর ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে। অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, কেবল পুলিশি অভিযানই এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়; এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, সামাজিক সচেতনতা এবং অভিভাবকদের সজাগ দৃষ্টি।
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
মানবাধিকার কর্মী ফারহা এমদা ইম্পা কিশোর গ্যাংয়ের বাড়বাড়ন্তকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি মনে করেন, অতীতে বিভিন্ন সময়ে কিশোর গ্যাংগুলোকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা আজকের এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সন্তানের বন্ধুপ্রীতি, চলাফেরা এবং সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ওপর কড়া নজরদারি রাখতে হবে।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক ব্যবহারের অভিযোগের ভিন্নমত পোষণ করে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান মাহমুদ ওয়াসিম বলেন, বর্তমান সময়ে কোনো দায়িত্বশীল রাজনীতিবিদ কিশোর গ্যাংয়ের প্রশ্রয় দিচ্ছেন না। তিনি দ্রুত এসব অপরাধমূলক তৎপরতা বন্ধে পুলিশ প্রশাসনকে আরও কঠোর ও সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।


