অন্যান্য

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ায় তিন ছাত্রীকে ‘জঙ্গি নাটক’ সাজিয়ে পুলিশে সোপর্দকারী সেই শিক্ষিকা নায়েমে পদায়ন

নিজস্ব প্রতিবেদক, কুমিল্লা

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের তিন ছাত্রীকে ভুয়া ‘জঙ্গি নাটক’ সাজিয়ে পুলিশে সোপর্দ করার ঘটনায় অভিযুক্ত সেই শিক্ষিকা অধ্যাপক নিলুফার সুলতানাকে পদোন্নতি দিয়ে বদলি করা হয়েছে। তাকে পদায়ন করা হয়েছে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমির (নায়েম) প্রশিক্ষণ বিশেষজ্ঞ হিসেবে।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) রাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। বুধবার বিকেলে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর আবুল বাসার ভূঞা।

বদলি হওয়া নিলুফার সুলতানা কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক কমিটির সদস্য এবং বিগত সরকারের আমলে তিনবার ভিক্টোরিয়া কলেজের শিক্ষক পরিষদের নেতা নির্বাচিত হন। এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অর্থ আত্মসাতের মামলায় অভিযুক্ত সাবেক অধ্যক্ষ রতন কুমার সাহার প্রধান সহযোগী হিসেবে তিনি কলেজের বিভিন্ন উন্নয়ন কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

ইসলামিক বই পেয়ে যেভাবে ‘জঙ্গি’ আখ্যা দেওয়া হয়

ঘটনাটির সূত্রপাত ঘটে ২০১৬ সালের ২৭ জুলাই মধ্যরাতে। তৎকালীন নবাব ফয়জুন্নেছা হলের সহকারী প্রভোস্ট নিলুফার সুলতানা হলের তিন ছাত্রীর কক্ষে ডা. জাকির নায়েকের লেকচার সমগ্র ও কিছু সাধারণ ধর্মীয় বই দেখতে পান। এই বইগুলোর অজুহাত তুলে তিনি তাদের আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেন এবং পরবর্তীতে তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়ের করা হয়।

ভুক্তভোগী তিন শিক্ষার্থী হলেন—হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সাবেক ছাত্রী ও নবাব ফয়জুন্নেছা হলের আবাসিক শিক্ষার্থী অ্যাডভোকেট কানিজ ফারহানা বাতুল, ব্যবস্থাপনা বিভাগের সাবেক ছাত্রী আরজিনা আক্তার চম্পা এবং সালমা আক্তার।

দীর্ঘ ৯ বছর ৯ মাস ২৭ দিন আইনি লড়াই ও সামাজিক কলঙ্কের ধকল সইবার পর চলতি বছরের ২৪ মে কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালত তাদের সব অভিযোগ থেকে খালাস দেন। আদালতে জঙ্গিবাদের কোনো অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তারা আইনি নিষ্কৃতি পান।

ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ ও বিচার দাবি

দীর্ঘ এক দশকের আইনি লড়াই আর সামাজিক নিপীড়ন থেকে মুক্তি পেলেও বিচার পাওয়া নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী নারীরা।

অ্যাডভোকেট কানিজ ফারহানা বাতুল আক্ষেপ করে বলেন, ‘প্রায় দশ বছর ধরে মামলাটি চলেছে। এ সময়ে কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাদের খোঁজ নেয়নি। এখন শুনছি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। এই কমিটির নাম দেওয়া উচিত “আজীবন তদন্ত কমিটি”। নয় বছরেও তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হলো না, অথচ অভিযুক্ত শিক্ষিকা এখন পদোন্নতি পেয়ে বদলি হয়ে চলে যাচ্ছেন। আমরা কি আসলেই এই অন্যায়ের বিচার পাব?’

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে অধ্যাপক নিলুফার সুলতানার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল ও বার্তা পাঠানো হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

কলেজ অধ্যক্ষের বক্তব্য

এ প্রসঙ্গে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর আবুল বাসার ভূঞা বলেন, ‘তাদের জীবনে যা ঘটে গেছে, তা কি আমরা কখনো ফিরিয়ে দিতে পারব? ভাগ্য ভালো, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে তারা মামলা থেকে মুক্তি পেয়েছেন। আমাদের তদন্ত কমিটিও প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলেছে, উদ্ধারকৃত বইগুলো সাধারণ ইসলামিক বই ছিল, কোনো জঙ্গিবাদের বই নয়।’ তবে অভিযুক্ত শিক্ষিকার বিরুদ্ধে কলেজ প্রশাসন থেকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment