নিজস্ব প্রতিবেদক, সোহেল হাওলাদার:
মাদকাসক্তির ভয়াবহতা ফুলবাড়িয়া থেকে সারা দেশে রূপ নিয়েছে মহামারিতে। পারিবারিক নির্যাতন, খুন ও অপরাধের নেপথ্যে মাদকের ভূমিকা নিয়ে দৈনিক পূর্বাচলের বিশেষ প্রতিবেদন। লিখেছেন সোহেল হাওলাদার।
মাদক কেনার টাকা না দেওয়ায় মা-বাবাকে মারধর, দা-চাকু নিয়ে ভয় দেখানো, আবার কোথাও মাদক কারবারিদের আস্তানায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ—ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় মাদকের ভয়াল থাবা এখন কেবল একটি জনপদের আইনশৃঙ্খলার সমস্যাই নয়, এটি রূপ নিয়েছে ঘরে ঘরে পারিবারিক অশান্তির মূলে। শুধু ফুলবাড়িয়া নয়, বর্তমান সময়ে সারা দেশেই মাদকের করাল গ্রাস এক ভয়াবহ মহামারিতে রূপ নিয়েছে। তুচ্ছ ঘটনা, পারিবারিক কলহ কিংবা আধিপত্য বিস্তার—সব ধরনের নৃশংসতা ও হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য অনুঘটক হিসেবে বারবার সামনে আসছে এই সর্বনাশা মাদক।
ফুলবাড়িয়ায় রূপ নিয়েছে পারিবারিক ও সামাজিক ট্র্যাজেডিতে
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় মাদকাসক্ত সন্তানের নির্যাতন থেকে বাঁচতে বাধ্য হয়ে সন্তানকে পুলিশের হাতে তুলে দিচ্ছেন অসহায় অভিভাবকেরা। আবার মাদক কারবার ঠেকাতে কোথাও কোথাও আইন নিজেদের হাতে তুলে নিচ্ছেন ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা। ফুলবাড়িয়া থানার তথ্য অনুযায়ী, গত চার মাসে মাদকসহ ৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করে ৪৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৩১ জন মাদক সেবনকারী ও কারবারিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও জরিমানা করা হয়েছে।
মাদকাসক্ত সন্তানের নির্যাতনের সাম্প্রতিক একটি করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে উপজেলার পুটিজানা ইউনিয়নের মৌহাতলা ও বালিয়ান গ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায়। উচ্চশিক্ষিত সন্তান কিংবা উঠতি বয়সের তরুণ—মাদকের টাকার জন্য মা-বাবাকে রক্তাক্ত করার মতো লোমহর্ষক ঘটনা ঘটে চলেছে। গত ২৪ জুলাই রাতে উপজেলার সোয়াইতপুর গ্রামে কাস্টমসের সিপাহি আবু রায়হান তালুকদার (৪৫) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত তরুণেরাও মাদকাসক্ত ছিল বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে। চান্দের বাজার, কুশমাইল ও দেওনাইপাড়সহ বিভিন্ন এলাকায় গ্রামবাসীর উদ্যোগে মাদকবিরোধী প্রতিরোধ গড়ে উঠলেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
সারা দেশের ভয়াবহ চিত্র: মাদক ছড়াচ্ছে অপরাধ ও খুন
ফুলবাড়িয়ার এই চিত্র কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং এটি সারা দেশের বর্তমান ভয়াবহ মাদক পরিস্থিতিরই একটি ক্ষুদ্র প্ৰতিচ্ছবি। সাম্প্রতিক জাতীয় গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনোভাবে অবৈধ মাদকের সঙ্গে যুক্ত, যার একটি বড় অংশই তরুণ ও কিশোর। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মাদকসেবী স্বীকার করেছে যে বর্তমানে খুব সহজেই ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন ও বিভিন্ন সিনথেটিক মাদক হাতে পৌঁছে যাচ্ছে।
মাদকের এই সহজলভ্যতা ও আসক্তি দেশের অপরাধ জগতের চালচিত্র পাল্টে দিয়েছে। তুচ্ছ কথা কাটাকাটি, মাদকের টাকার জোগান বা এলাকার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে রাজধানী থেকে শুরু করে মফস্বল সর্বত্রই খুনখারাবির মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। মাদকাসক্তির জেরে স্বামী কর্তৃক স্ত্রী হত্যা, সন্তানের হাতে মাতা-পিতা খুন, কিংবা মাদক কারবারকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এখন নিত্যদিনের খবরে পরিণত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযান, চেকপোস্ট ও সাঁড়াশি অভিযান সত্ত্বেও মাদকের এই ভয়াল আগ্রাসন পুরোপুরি থামানো যাচ্ছে না।
করণীয় ও বিশেষজ্ঞদের মতামত
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কেবল পুলিশি অভিযান বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে মাদকের এই মহাভিত্তিক বিস্তার রোধ করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন পারিবারিক সচেতনতা এবং সামাজিক আন্দোলন। মাদকের বিরুদ্ধে তরুণ সমাজকে রক্ষা করতে স্কুল-কলেজ স্তর থেকে শুরু করে প্রতিটি পরিবারে নৈতিক শিক্ষা ও নজরদারি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং আইনের কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।
ফুলবাড়িয়ার মতো সারা দেশের প্রতিটি জনপদকে মাদকের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করতে প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পাশাপাশি দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের জনগণকে এক হয়ে ‘সামাজিক যুদ্ধ’ ঘোষণা করতে হবে, তবেই রক্ষা পাবে আগামীর প্রজন্ম।


