অন্যান্য

ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম আজ: বড়পীর হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর বর্ণাঢ্য জীবন ও শিক্ষা

দৈনিক পূর্বাচল প্রতিবেদক:

ইসলামের ইতিহাসে মহান মনীষীদের অম্লান স্মৃতির আলো আজও পথভোলা মানুষকে সত্য ও সঠিক পথের দিশা দেখায়। তেমনই এক অনন্য পুরুষ, কাদেরিয়া সুফি ধারার প্রতিষ্ঠাতা, প্রখ্যাত আলেম ও বড়পীর হজরত শেখ আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)। বিশ্বজুড়ে সুফি অনুসারী ও ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের কাছে হিজরি রবিউস সানি মাসের এগারো তারিখটি ‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদহম’ হিসেবে অত্যন্ত শ্রদ্ধাপূর্ণ ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে।

আজ বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬) যথাযোগ্য মর্যাদায় দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে পবিত্র ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম। তবে আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং মহান এই অলি ও আলেমের বর্ণাঢ্য জীবন, সুন্নাহর অনুসরণ এবং দ্বীনি শিক্ষা গ্রহণ করাই এই দিবসের প্রকৃত উদ্দেশ্য।

ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহমের ইতিহাস ও শাব্দিক অর্থ

শব্দগত দিক থেকে ‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদহম’ ফারসি ভাষার দুটি শব্দের চমৎকার এক সমন্বয়। ‘ফাতিহা’-এর অর্থ দোয়া, মোনাজাত, জিয়ারত বা কোনো বুজুর্গের রুহের মাগফিরাত ও মর্যাদা কামনায় কুরআন তিলাওয়াত করে ইসালে সওয়াব করা। আর ‘ইয়াজদহম’ একটি ফারসি সংখ্যাবাচক শব্দ, যার অর্থ ‘এগারো’।

হিজরি রবিউস সানি (বা রবিউল আখির) মাসের ১১তম দিনে আবদুল কাদির জিলানি (রহ.) ইন্তেকাল করেন। তাই প্রতি বছর তাঁর অম্লান স্মরণে আয়োজিত ইসালে সওয়াব ও মোনাজাতের মাহফিলকে ‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদহম’ বলা হয়।

আধ্যাত্মিক সাধক আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)

৪৭০ হিজরিতে (১০৭৮ খ্রিষ্টাব্দে) ইরানের জিলান প্রদেশের কাস্পিয়ান সমুদ্রের তীরবর্তী অঞ্চলে জন্ম নেন এই মহাপুরুষ। পিতৃসূত্রে তিনি হজরত হাসান (রা.) এবং মাতৃসূত্রে হজরত হোসাইন (রা.)-এর বংশধর ছিলেন।

বাল্যকালেই উচ্চতর জ্ঞানার্জনের অদম্য তৃষ্ণা নিয়ে তিনি তৎকালীন জ্ঞানের কেন্দ্রবিন্দু বাগদাদে গমন করেন। শায়খ আবু জাকারিয়া তাবরিজি (রহ.)-সহ সময়ের সেরা আলেমদের সান্নিধ্যে থেকে তাফসির, হাদিস, ফিকহ ও আরবি সাহিত্যে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন তিনি। ইতিহাস, ভূগোল, দর্শন ও কাব্যে অগাধ পাণ্ডিত্যের পাশাপাশি তিনি ছিলেন হাম্বলি ও শাফেয়ি মাজহাবের শীর্ষস্থানীয় ফকিহ।

আল্লাহ তাআলা তাঁর অনুগত ও বুজুর্গ বান্দাদের মর্যাদা সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন—

أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ «জেনে রাখো, নিশ্চয়ই আল্লাহর অলি বা বন্ধুদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবেন না।» (সুরা ইউনুস: আয়াত ৬২)

বাগদাদে তাঁর বয়ান ও রূহানি নসিহত শোনার জন্য হাজার হাজার মানুষের সমাগম হতো। তাঁর সুগভীর জ্ঞান ও হৃদয়স্পর্শী প্রজ্ঞায় মুগ্ধ হয়ে অজস্র মানুষ ইসলাম ও হিদায়েতের সরল পথ খুঁজে পান। এমনকি সুলতান নুরুদ্দিন জেনকি ও ক্রুসেডজয়ী গাজি সালাহউদ্দিন আইয়ুবির বিশেষ কয়েকজন উপদেষ্টা ও সেনাপতি সরাসরি তাঁর ছাত্র ছিলেন।

তাসাউফের এই সুমহান সংস্কারককে পরম আধ্যাত্মিক উচ্চ মর্যাদার কারণে ‘গাউসুল আজম’ বা ‘বড়পীর’ নামে ডাকা হয়। তাঁর কালজয়ী গ্রন্থাবলি—‘গুনিয়াতুত তালিবিন’, ‘ফাতহুল গাইব’, ‘আল-ফাতহুর রাব্বানি’ ও ‘কাসিদায়ে গাউসিয়া’ আজও জ্ঞানপিপাসুদের পরম সম্পদ।

উদযাপন ও শরয়ি বিধান

হিজরি ৫৬১ সনের ১১ রবিউস সানি (১১৬৬ খ্রিষ্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি) ইরাকের বাগদাদে ইন্তেকাল করেন এই মহান সুফিসাধক। সেখানেই অবস্থিত তাঁর মাজার শরিফ।

এ দিনে মুসলিম সমাজ দরুদ পাঠ, দান-সদকা ও কুরআন পাঠের মাধ্যমে তাঁর রুহের মাগফিরাতের জন্য ইসালে সওয়াব করে থাকে। মৃত ব্যক্তির জন্য ভালো কাজ ও সওয়াব পৌঁছানো প্রসঙ্গে হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—

إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلاَّ مِنْ ثَلاَثَةٍ… «মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে, তখন তার তিনটি আমল ব্যতীত বাকি সব আমলের পথ বন্ধ হয়ে যায়—১. সদকায়ে জারিয়া, ২. এমন জ্ঞান যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হয়, এবং ৩. এমন নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।» (মুসলিম ৪২০৫)

তবে ওলামায়ে কেরামের মতে, এ দিনকে কেন্দ্র করে লাইটিং, আলোকসজ্জা বা অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতায় মেতে ওঠা ইসলামে অনুমোদিত নয়। কোনো বিশেষ স্থান সাজানো বা বাহ্যিক আড়ম্বর নয়; বরং বড়পীর সাহেবের সুন্নাহভিত্তিক শিক্ষাকে জীবনের পাথেয় বানানোই এ দিনের প্রকৃত দাবি।

‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদহম’ পালনের আসল বার্তাটি কেবল বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনে মিলাদ বা দোয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তাঁর মতো চারিত্রিক মাধুর্য গড়ে তোলা, সততা ও আমানতদারিতা বজায় রাখার মাঝেই নিহিত রয়েছে এই দিবসের প্রকৃত শিক্ষা।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment