নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বাবা হিন্দু ধর্মাবলম্বী এবং পেশায় মাছ বিক্রেতা (‘জেলে’) ছিলেন বলে মন্তব্য করেছেন কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট মো. ফজলুর রহমান। গত বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এই বিতর্কিত মন্তব্য করেন। তবে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক নথিপত্র এবং বিশ্বখ্যাত তথ্যসূত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ফজলুর রহমানের এই দাবি সম্পূর্ণ অসত্য, ভিত্তিহীন ও ঐতিহাসিক তথ্যের চরম বিকৃতি।
ঐতিহাসিক সত্য ও পারিবারিক পরিচয়
ব্রিটানিকা এবং উইকিপিডিয়ার ‘জিন্নাহ ফ্যামিলি’ সংক্রান্ত প্রামাণ্য নথি অনুযায়ী, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বাবার প্রকৃত নাম জিন্নাহভাই পুঞ্জা। তিনি মূলত ভারতের গুজরাটের কাথিয়াওয়ার অঞ্চলের অধিবাসী ছিলেন। পরবর্তীতে ব্যবসায়িক সূত্রে তিনি করাচিতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সাধারণ কোনো জেলে বা মাছ বিক্রেতা নয়, বরং তিনি ছিলেন করাচির একজন অত্যন্ত ধনী ও প্রতিষ্ঠিত মুসলিম ব্যবসায়ী।
ইতিহাস গবেষকদের মতে, জিন্নাহভাই পুঞ্জা টেক্সটাইল, শস্য এবং আন্তর্জাতিক শিপিং ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তৎকালীন সময়ের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ‘গ্রাহাম শিপিং অ্যান্ড ট্রেডিং’-এর সঙ্গে অংশীদারিত্বে তার ব্যবসা পরিচালিত হতো এবং তিনি এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের দায়িত্বেও ছিলেন।
ধর্মান্তর ও পারিবারিক পটভূমি
ঐতিহাসিক গবেষণায় জিন্নাহর পরিবার সম্পর্কে আরও জানা যায়:
-
পূর্বপুরুষের পটভূমি: বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ডি. এন. পানিগ্রাহীর গবেষণা অনুযায়ী, জিন্নাহর দাদা পুঞ্জা মেঘজি কয়েক প্রজন্ম আগে হিন্দু লোহানা সম্প্রদায় থেকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন।
-
পিতার ধর্মীয় পরিচয়: জিন্নাহর বাবা জিন্নাহভাই পুঞ্জা জন্মসূত্রে কট্টর মুসলিম ছিলেন। তারা গুজরাটের শিয়া মুসলিমদের ‘খোঁজা’ সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
-
পরিবেশ ও লালন-পালন: গুজরাটি সংস্কৃতির প্রভাব থাকলেও জিন্নাহভাই পুঞ্জা তার সন্তানদের হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাব থেকে দূরে রেখে রক্ষণশীল ইসলামিক নিয়মে বড় করেন এবং পবিত্র কুরআন শিক্ষার পাশাপাশি ইসলামিক নাম রাখেন।
প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ স্ট্যানলি ওলপার্ট তার বিশ্বনন্দিত ‘জিন্নাহ অফ পাকিস্তান’ গ্রন্থে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, ১৮৭৬ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর জন্মের সময় তার বাবা করাচির একজন সুপরিচিত ও সফল মুসলিম ব্যবসায়ী ছিলেন। পূর্বপুরুষদের ধর্মান্তরের কোনো কোনো প্রাচীন জনশ্রুতি বা লোককথাকে বর্তমান সময়ে খণ্ডিতভাবে উপস্থাপন করা হলেও, জিন্নাহর নিজের বাবা হিন্দু বা জেলে ছিলেন—এমন দাবির কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই।
রাজনৈতিক বা জনসমাবেশে এ ধরনের যাচাইহীন ও ভুল তথ্য প্রচার কেবল ইতিহাসকেই বিকৃত করে না, বরং জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে বলে মনে করছেন ইতিহাস বিশ্লেষকেরা।


