অন্যান্য

পেট ভরলেও কেন পুষ্টির অভাব ঘটছে?

বিশেষ প্রতিবেদন

লেখক: ড. মানসুরা মকবুল, সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ারপারসন, খাদ্যপ্রযুক্তি ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

আমরা প্রতিদিন পেট ভরে খাবার খাচ্ছি, ক্ষুধা নিবারণ হচ্ছে, কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমাদের শরীর কি প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাচ্ছে? বর্তমান সময়ে পেট ভরে খাওয়ার পরও শরীরে পুষ্টির অভাব রয়ে যাচ্ছে। খাবারে ভিটামিন, খনিজ এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি আজ জনস্বাস্থ্যকে এক চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। বিশ্বব্যাপী ১৪ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর পালিত হচ্ছে ‘পুষ্টিহীনতা সচেতনতা সপ্তাহ’ [cite: বিশ্বব্যাপী ১৪ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর পালিত হচ্ছে ‘পুষ্টিহীনতা সচেতনতা সপ্তাহ’]। এ উপলক্ষে কেন খাদ্যের পুষ্টিগুণ কমছে, এর ফলে কী কী সমস্যা হচ্ছে এবং ব্যক্তি ও সমাজ পর্যায়ে আমাদের করণীয় কী—তা নিয়েই আজকের এই বিশেষ আয়োজন [cite: এ উপলক্ষে কেন খাদ্যের পুষ্টিগুণ কমছে, এর ফলে কী কী সমস্যা হচ্ছে এবং ব্যক্তি ও সমাজ পর্যায়ে আমাদের করণীয় কী— তা নিয়ে এবারের আয়োজন]।

খাদ্যের পুষ্টিগুণ কেন কমছে?

আমাদের খাদ্যতালিকার পুষ্টিমান কমে যাওয়ার পেছনে বেশ কিছু প্রধান কারণ রয়েছে:

  • রাসায়নিকের ব্যবহার: ফসল দ্রুত বড় করতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যাপক ব্যবহার মাটির উর্বরতা ও অণুজীব নষ্ট করছে [cite: ফসল দ্রুত বড় করতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যাপক ব্যবহার মাটির উর্বরতা ও অণুজীব নষ্ট করছে]। এতে মাটি দুর্বল হয়ে ফসলে ভিটামিন ও খনিজ উপাদানের পরিমাণ কমিয়ে দেয়।

  • একই জমিতে বারবার চাষ: আর্থিক লাভের আশায় একই জমিতে বারবার একই ফসল চাষ করা হয়। সঠিকভাবে ফসল পরিবর্তন, কম্পোস্ট ও জৈব উপাদান ব্যবহার না করলে মাটির উর্বরতা কমে যায় [cite: সঠিকভাবে ফসল পরিবর্তন, কম্পোস্ট ও জৈব উপাদান ব্যবহার না করলে ধীরে ধীরে মাটির উর্বরতা কমে যায়]।

  • অপরিপক্ব ফসল সংগ্রহ: পরিবহনের সুবিধার্থে ফল ও সবজি পাকার আগেই তুলে ফেলা হয় এবং পরে রাসায়নিক দিয়ে পাকানো হয়, যা স্বাভাবিক পুষ্টির বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে [cite: পরিবহনের সুবিধার্থে ফল ও সবজি পাকার আগেই তুলে ফেলা হয় এবং পরে রাসায়নিক দিয়ে পাকানো হয়, যা স্বাভাবিক পুষ্টির বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে]।

  • অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাতকরণ: চাল যত বেশি ছাঁটাই (পলিশ) করা হয়, ফাইবার ও বি-ভিটামিন তত কমে যায়। একইভাবে রিফাইন্ড ময়দা বা প্যাকেটের খাবারেও পুষ্টি থাকে না বললেই চলে।

  • ভেজাল ও প্রিজারভেটিভ: খাবারে ভেজাল ও অনিরাপদ প্রিজারভেটিভের ব্যবহার শুধু স্বাস্থ্যের ক্ষতিই করে না, বরং প্রাকৃতিক পুষ্টিগুণ নষ্ট করে দেয় [cite: খাবারে ভেজাল ও অনিরাপদ প্রিজারভেটিভের ব্যবহার শুধু স্বাস্থ্যের ক্ষতিই করে না, বরং প্রাকৃতিক পুষ্টিগুণ নষ্ট করে দেয়]।

পুষ্টিহীনতায় যেসব সমস্যা হচ্ছে

খাবারের পুষ্টিমান কমে গেলে পেট ভরা থাকলেও শরীরে আয়রন, ভিটামিন এ, আয়োডিন ও জিংকের মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি হতে পারে [cite: খাবারের পুষ্টিমান কমে গেলে পেট ভরা থাকলেও শরীরে আয়রন, ভিটামিন এ, আয়োডিন, জিংকসহ প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাব হতে পারে]। এর ফলে নিচের সমস্যাগুলো দেখা দিচ্ছে:

  • রক্তস্বল্পতা, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং দৃষ্টিশক্তির সমস্যা [cite: এর ফলে রক্তস্বল্পতা, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া, দৃষ্টিশক্তির সমস্যা, শিশুর বেড়ে ওঠায় দেরি এবং বড়দের কর্মক্ষমতা কমে যেতে পারে]।

  • শিশুর বেড়ে ওঠায় বিলম্ব এবং বড়দের কর্মক্ষমতা হ্রাস [cite: এর ফলে রক্তস্বল্পতা, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া, দৃষ্টিশক্তির সমস্যা, শিশুর বেড়ে ওঠায় দেরি এবং বড়দের কর্মক্ষমতা কমে যেতে পারে]।

  • গর্ভধারণ থেকে শিশুর দুই বছর বয়স পর্যন্ত পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাবে শারীরিক ও মেধার বিকাশ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া [cite: গর্ভধারণ থেকে শিশুর দুই বছর বয়স পর্যন্ত পর্যাপ্ত পুষ্টি না পেলে শারীরিক ও মেধার বিকাশ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে]।

  • ফাস্টফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের আধিক্যের কারণে স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি [cite: মাছ, শাকসবজি, ডাল ও পূর্ণ শস্যের মতো প্রচলিত খাবারের পরিবর্তে প্রক্রিয়াজাত খাবার, চিনিযুক্ত পানীয় ও ফাস্টফুড বেশি খাওয়ার ফলে স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগ বাড়ছে]।

আমাদের করণীয় ও সমাধান

এই সংকট মোকাবেলায় ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন:

  • টেকসই কৃষি: কৃষিতে টেকসই ও বৈচিত্র্যপূর্ণ চাষ বাড়াতে হবে [cite: খাবারের পুষ্টিমান নিশ্চিত করতে কৃষিতে টেকসই ও বৈচিত্র্যপূর্ণ চাষ বাড়াতে হবে]। ধান ছাড়াও ডাল, তেলবীজ, শাকসবজি, ফল ও পুষ্টিকর দেশীয় জাতের চাষ বাড়াতে হবে [cite: ফসল পরিবর্তনের পাশাপাশি ধান ছাড়াও ডাল, তেলবীজ, শাকসবজি, ফল ও পুষ্টিকর দেশীয় জাতের চাষ বাড়ানো প্রয়োজন]।

  • খাদ্য নিরাপত্তা ও সচেতনতা: খাদ্য নিরাপত্তা ও ভেজালবিরোধী ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে এবং ভোক্তাদের ভেজাল খাবার চেনা ও এড়িয়ে চলার বিষয়ে সচেতন করতে হবে [cite: খাদ্য নিরাপত্তা ও ভেজালবিরোধী ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা ও ভেজাল খাবার চেনা ও এড়িয়ে চলার বিষয়ে ভোক্তাদের সচেতন করতে হবে]।

  • ফর্টিফিকেশন বা পুষ্টি সংযোজন: প্রয়োজন অনুযায়ী খাবারে পুষ্টি যোগ করা; যেমন— ভোজ্য তেলে ভিটামিন এ, লবণে আয়োডিন এবং আটায় আয়রন ও ফলিক অ্যাসিড যোগ করা [cite: প্রয়োজন অনুযায়ী খাবারে পুষ্টি যোগ করার ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। যেমন— ভোজ্য তেলে ভিটামিন এ, লবণে আয়োডিন এবং আটায় আয়রন ও ফলিক অ্যাসিড যোগ করা যেতে পারে]।

  • শিক্ষা ও পারিবারিক অভ্যাস: স্কুলের পাঠ্যক্রমে বাস্তবভিত্তিক পুষ্টিশিক্ষা যুক্ত করা এবং শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর গুরুত্ব পরিবারকে জানানো [cite: স্কুলের পাঠ্যক্রমে বাস্তবভিত্তিক পুষ্টিশিক্ষা যুক্ত করতে হবে। শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর গুরুত্ব সম্পর্কে পরিবারকে জানাতে হবে]।

  • প্রাকৃতিক ও রঙিন খাবার নির্বাচন: যতটা সম্ভব প্রাকৃতিক ও কম প্রক্রিয়াজাত খাবার বেছে নিতে হবে। খাবারের পাতে বিভিন্ন রঙের শাকসবজি, হলুদ বা কমলা রঙের ফল, ডাল, মাছ, ডিম ও বাদাম রাখার অভ্যাস করতে হবে [cite: খাবারের পাতে বিভিন্ন রঙের শাকসবজি, হলুদ বা কমলা রঙের ফল ও সবজি, ডাল, মাছ, ডিম ও বাদাম রাখতে হবে]।

সুস্থ ও সবল জাতি গঠনে পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার বিকল্প নেই। সচেতনতাই পারে আমাদের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পুষ্টির নিশ্চয়তা দিতে।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment