নিজস্ব প্রতিবেদক | দৈনিক পূর্বাচল
দেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রকোপে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছেন অন্তঃসত্ত্বা নারীরা। সম্প্রতি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ৩৫ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা এক প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনা দেশজুড়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন, গর্ভাবস্থায় ডেঙ্গু সংক্রমণ মা ও অনাগত সন্তান উভয়ের জন্যই মারাত্মক প্রাণঘাতী হতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরে মশাবাহিত এ রোগে মারা গেছেন ১৪৩ জন, যার মধ্যে নারী ৭৩ জন। পরিসংখ্যানে পুরুষ আক্রান্তের হার কিছুটা বেশি হলেও নারীদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর হার উদ্বেগজনক। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে এখনও আলাদাভাবে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ডেঙ্গু আক্রান্ত বা মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট হিসাব সংরক্ষণ করা হয় না।
গবেষণায় ভয়াবহ চিত্র ‘গর্ভাবস্থায় ডেঙ্গু সংক্রমণে মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যঝুঁকি’ শীর্ষক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ডেঙ্গু আক্রান্ত অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ক্ষেত্রে সুস্থ প্রসূতির তুলনায় মৃত্যুর ঝুঁকি ৪ দশমিক ১৪ গুণ বেশি। আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ‘ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল হেলথ’-এ প্রকাশিত প্রায় ৩৯ হাজার ৬৩২ জন অন্তঃসত্ত্বা নারীর তথ্য সংবলিত ওই গবেষণায় আরও দেখা যায়, মৃত সন্তান প্রসবের ঝুঁকি ২ দশমিক ৭১ গুণ এবং নবজাতকের মৃত্যুর ঝুঁকি ৩ দশমিক ০৩ গুণ বেশি।
এছাড়া আক্রান্ত প্রসূতিদের মধ্যে ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের হার ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ, সময়ের আগে সন্তান প্রসবের হার ১৪ শতাংশ, মাতৃ রক্তক্ষরণের হার ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ, গর্ভপাতের হার ৬ শতাংশ এবং মৃত সন্তান প্রসবের হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা ও পরামর্শ আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন জানান, ডেঙ্গু অন্তঃসত্ত্বা নারীদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করে। তাই বাসায় মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত রাখতে বাড়তি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সামান্য জ্বর হলেই অবিলম্বে ডেঙ্গু পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। আক্রান্ত শনাক্ত হলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার তাগিদ দেন এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।
কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের স্ত্রী ও প্রসূতি রোগ বিশেষজ্ঞ এবং সার্জন ডা. ছাবিকুন নাহার বলেন, “অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় এমনিতেই নারীদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। এর মধ্যে ডেঙ্গু হলে রক্তচাপ কমে যাওয়া, ইলেকট্রোলাইট ইমব্যালান্স এবং ডেলিভারির সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের মতো মারাত্মক জটিলতা দেখা দেয়।”
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান অন্তঃসত্ত্বা ডেঙ্গু রোগীদের বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনার পরামর্শ দিয়ে বলেন, শুরু থেকেই প্রসূতিদের স্ত্রীরোগ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞের যৌথ তত্ত্বাবধানে রাখা হলে গুরুতর ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
দেশজুড়ে ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে দেশজুড়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫০ হাজার ২৭৬ জন। বিশেষ করে ঢাকা, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগে সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার জানান, বর্তমানে সারা দেশে এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব পরিমাপক ব্রুটো ইনডেক্স ২০-এর ওপরে রয়েছে, যা ডেঙ্গু ছড়ানোর উপযোগী মাত্রা। অবিলম্বে এডিস মশার লার্ভা ও ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত করে কার্যকরভাবে মশা নিয়ন্ত্রণের তাগিদ দিয়েছেন এই কীটতত্ত্ববিদ।


