ফিচার ডেস্ক, দৈনিক পূর্বাচল:
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ঘন ঘন ব্যথানাশক বা পেইনকিলার খাওয়া কিডনির জন্য কতটা বিপজ্জনক? জেনে নিন কীভাবে এই সাধারণ অভ্যাসটি নীরবে ধ্বংস করছে আপনার কিডনি।
সামান্য মাথা ব্যথা, দাঁত ব্যথা, পিঠ বা জয়েন্টের যন্ত্রণায় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ফার্মেসি থেকে নিজে নিজে ব্যথানাশক (Painkiller) ওষুধ কিনে খাওয়া আমাদের সমাজে অত্যন্ত সাধারণ একটি অভ্যাস। সাময়িক আরাম মিললেও এই আপাত নিরীহ অভ্যাসটি যে শরীরের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ‘কিডনি’কে নীরবে ধ্বংস করে দিচ্ছে, তা আমরা অনেকেই টের পাচ্ছি না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ব্যথানাশকের এই অপব্যবহারের কারণে কিডনি বিকল হওয়াকে বলা হয় ‘অ্যানালজেসিক নেফ্রোপ্যাথি’ (Analgesic Nephropathy)।
যেভাবে ক্ষতি করে ব্যথানাশক ওষুধ
আমাদের কিডনি প্রতিদিন শরীরের রক্ত ফিল্টার বা ছাঁকন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বর্জ্য পদার্থ বের করে দেয়। এই জটিল কাজের জন্য কিডনিতে সার্বক্ষণিক প্রচুর রক্ত প্রবাহের প্রয়োজন হয়।
যখন কোনো ব্যক্তি চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ঘন ঘন বা উচ্চ মাত্রায় সাধারণ ব্যথানাশক ওষুধ, বিশেষ করে NSAIDs (Non-Steroidal Anti-Inflammatory Drugs) গ্রহণ করেন, তখন তা কিডনিতে রক্ত সঞ্চালনে সরাসরি বাধা দেয়।
-
রক্ত প্রবাহ হ্রাস: ব্যথানাশক ওষুধগুলো শরীরে ‘প্রস্টাগ্ল্যান্ডিন’ (Prostaglandin) নামক রাসায়নিকের উৎপাদন কমিয়ে দেয়। স্বাভাবিক অবস্থায় এই রাসায়নিকটি কিডনির রক্তনালীগুলোকে প্রসারিত রেখে রক্ত সরবরাহ সচল রাখে।
-
ছাঁকনি নষ্ট হওয়া: রক্ত প্রবাহ কমে যাওয়ায় কিডনির কার্যকারী একক বা ছাঁকনিগুলো (নেফ্রন) প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ও পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে এগুলো ধীরে ধীরে অকেজো হতে শুরু করে।
-
স্থায়ী ক্ষতি: দীর্ঘদিন ধরে এই অবহেলা চলতে থাকলে কিডনি স্থায়ীভাবে সংকুচিত হয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে তার স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলে।
চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা: কিডনি অত্যন্ত সহনশীল একটি অঙ্গ। সাধারণত কিডনির কার্যক্ষমতা ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ নষ্ট হওয়ার আগে বাইরে থেকে কোনো বড় উপসর্গ বা সংকেত দেখা যায় না। যখন লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়, ততক্ষণে কিডনি প্রায় শেষ পর্যায়ে (Chronic Kidney Disease) চলে যায়। এই নীরব ধ্বংসযজ্ঞের কারণেই চিকিৎসকরা ব্যথানাশক ওষুধকে ‘নীরব ঘাতক’ বলে অভিহিত করেন।
কিডনি ক্ষতির প্রাথমিক লক্ষণসমূহ
ব্যথানাশকের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে কিডনি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে শরীরে মূলত নিচের লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে পারে:
-
শরীরে অতিরিক্ত পানি জমার কারণে হাত, পা, মুখ বা চোখের চারপাশ ফুলে যাওয়া।
-
প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, রঙের পরিবর্তন কিংবা প্রস্রাবে অতিরিক্ত ফেনা হওয়া।
-
সব সময় তীব্র ক্লান্তি, অলসতা ও সামান্য পরিশ্রমে শ্বাসকষ্ট অনুভব করা।
-
হঠাৎ করে ব্লাড প্রেসার বা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বেড়ে যাওয়া।
-
খাবারে তীব্র অরুচি, বমি বমি ভাব বা ঘন ঘন বমি হওয়া।
কিডনি সুরক্ষিত রাখতে আমাদের করণীয়
সামান্য ব্যথোতেই মুঠো মুঠো ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়ার ক্ষতিকর অভ্যাস আজই বর্জন করা জরুরি। কিডনি সচল রাখতে চিকিৎসকরা নিচের নিয়মগুলো মেনে চলার পরামর্শ দেন:
১. রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ: যেকোনো ধরনের শারীরিক ব্যথায় ফার্মেসি থেকে নিজে নিজে ওষুধ না কিনে অবশ্যই একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ২. বিকল্প উপায়ে উপশম: হালকা ব্যথায় শুরুতেই ওষুধের ওপর নির্ভর না করে গরম বা ঠাণ্ডা সেঁক, পর্যাপ্ত বিশ্রাম বা ফিজিওথেরাপি ও প্রাকৃতিক উপায়ে উপশমের চেষ্টা করুন। ৩. পর্যাপ্ত পানি পান: দৈনিক শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত পরিমাণ নিরাপদ পানি পান করুন, যা কিডনি থেকে ক্ষতিকর টক্সিন বের করে দিতে সাহায্য করে। ৪. ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের বাড়তি সতর্কতা: যাদের আগে থেকেই ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা কিডনির সামান্য সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য চিকিৎসকের কঠোর নজরদারি ছাড়া যেকোনো ধরনের ব্যথানাশক ওষুধ স্পর্শ করাও চরম বিপজ্জনক।
সাময়িক একটু আরামের জন্য নিজের অজান্তে নিজের জীবনকে চিরতরে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবেন না। আপনার সচেতনতাই পারে শরীরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দুটি অঙ্গকে সুস্থ ও সচল রাখতে।

