বিশেষ নিবন্ধ | দৈনিক পূর্বাচল
তারিখ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬
যার অর্থ-সম্পদ কম, ঘরে পর্যাপ্ত খাবার নেই, ভালো পোশাক বা মাথার ওপর নিজের ঘর নেই—সাধারণত তাকেই আমরা গরিব বলে মনে করি। সমাজ ও অর্থনীতির বিচারে এই সংজ্ঞা অমূলক নয়। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের প্রকৃত দারিদ্র্যের হিসাব কেবল দুনিয়ার সম্পদ দিয়ে হয় না। একজন মানুষ দুনিয়ায় সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেও আখিরাতে নিঃস্ব হতে পারে। আবার দুনিয়ায় দরিদ্র হয়েও সে আল্লাহর কাছে হতে পারে সবচেয়ে সমৃদ্ধ ও সফল।
রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে একদিন এমনই এক প্রশ্ন করেছিলেন, যা মানুষের প্রচলিত ‘গরিব’ ধারণাকে আমূল বদলে দেয়। তিনি বলেন, ‘তোমরা কি জানো, নিঃস্ব বা দেউলিয়া ব্যক্তি কে?’
সাহাবিরা বললেন, ‘আমাদের মধ্যে নিঃস্ব সে, যার কোনো দিরহাম বা সম্পদ নেই।’ তখন নবীজি (সা.) বললেন, ‘আমার উম্মতের প্রকৃত নিঃস্ব সে, যে কিয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও জাকাত নিয়ে উপস্থিত হবে; অথচ সে কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, কারও সম্পদ আত্মসাৎ করেছে, কারও রক্ত ঝරিয়েছে এবং কাউকে প্রহার করেছে।’ এরপর তার নেক আমলগুলো একে একে নির্যাতিত ব্যক্তিদের দিয়ে দেওয়া হবে। নেক আমল শেষ হয়ে গেলে তাদের পাপ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (মুসলিম, হাদিস: ২৫৮১)
ডিজিটাল যুগে হক্কুল ইবাদের নতুন চ্যালেঞ্জ
বর্তমান সময়ে হাদিসটির গুরুত্ব আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি মন্তব্য, একটি পোস্ট কিংবা একটি শেয়ার মুহূর্তের মধ্যে হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। যাচাই না করে কারও বিরুদ্ধে অপবাদ ছড়িয়ে দেওয়া, ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য প্রকাশ করা, কাউকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করা কিংবা মন্তব্যের মাধ্যমে কাউকে অপমান করা অনেকের কাছে সামান্য ব্যাপার মনে হতে পারে। অথচ এগুলো মানুষের সম্মান ও অধিকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। কুরআন স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছে—‘তোমরা একে অন্যের গিবত করো না।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ১২)
মানুষের অধিকার বা ‘হক্কুল ইবাদ’ ইসলামে এত গুরুত্বপূর্ণ যে শুধু আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়াই যথেষ্ট নয়, যদি অন্য মানুষের অধিকার নষ্ট করা হয়ে থাকে। কারও টাকা আত্মসাৎ করলে তা ফেরত দিতে হবে; কারও ওপর জুলুম করলে তার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে; কারও সম্মানহানি করলে যথাসম্ভব তা সংশোধন করতে হবে। বিদায় হজের ভাষণে রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষের জান, মাল ও সম্মানের পবিত্রতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন—‘তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সম্মান তোমাদের পরস্পরের জন্য হারাম।’ (বুখারি, হাদিস: ৬৭)
আত্মসমালোচনা ও প্রকৃত সফলতা
লক্ষণীয় বিষয় হলো, সেই দেউলিয়া ব্যক্তি নামাজ, রোজা ও জাকাত নিয়েই কিয়ামতের ময়দানে উপস্থিত হবে। অর্থাৎ সে একেবারে ইবাদতহীন মানুষ নয়। কিন্তু মানুষের প্রতি তার অন্যায় সেই নেক আমলগুলোকেই নিঃশেষ করে দেবে। তাই শুধু কত নামাজ পড়েছি, কত রোজা রেখেছি—তার হিসাব করলেই হবে না। পাশাপাশি দেখতে হবে, আমার হাত ও মুখ থেকে কত মানুষ নিরাপদ?
দুনিয়ায় যার সম্পদ নেই, সে সাময়িকভাবে অভাবগ্রস্ত। কিন্তু যার নেক আমল নেই, কিংবা অন্যের অধিকার নষ্ট করতে করতে নিজের নেক আমল হারিয়ে ফেলেছে, তার দারিদ্র্যই চূড়ান্ত। দুনিয়ার গরিব মানুষকে দান করে সমৃদ্ধ করা যায়; কিন্তু আখিরাতের সেই নিঃস্বতা থেকে মুক্তির সুযোগ কেবল মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।
তাই প্রতিদিন নিজের আমল যাচাই করা দরকার। আজ আমি কারও মনে কষ্ট দিয়েছি কি না, কারও অধিকার নষ্ট করেছি কি না, কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন কিছু লিখেছি কি না যা অন্যের সম্মান ক্ষুণ্ন করে—এসব প্রশ্ন নিজের কাছে রাখা উচিত। পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে—‘সফল হয়েছে সে, যে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছে; আর ব্যর্থ হয়েছে সে, যে তাকে কলুষিত করেছে।’ (সুরা শামস, আয়াত : ৯-১০)
মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে হাদিসের আলোকে আমল করার এবং মানুষের অধিকার রক্ষায় সচেতন হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক


