তারিখ: ২৪ অক্টোবর, ২০২৬
কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী মান্না দের ১৩তম মহাপ্রয়াণবার্ষিকী আজ। ২০০৯ সালে বাংলা একাডেমিতে তাঁর সফর ও জীবনের স্মৃতিচারণ নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন। পড়ুন দৈনিক পূর্বাচলে।
ঢাকা: বাংলা গানের স্বর্ণযুগের অবিসংবাদিত পুরুষ, কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী মান্না দের ১৩তম মহাপ্রয়াণবার্ষিকী আজ। ১৯ শতকের শেষ ও ২০ শতকের বাংলা গানের ভাণ্ডারকে যিনি ঋদ্ধ করে গেছেন সুরের জাদুতে, তাঁর জীবন ও সৃষ্টি আজও কোটি শ্রোতার হৃদয়ে অমর। মান্না দের প্রয়াণবার্ষিকীতে তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের নানা দিক এবং ২০০৯ সালে বাংলা একাডেমিতে তাঁর সশরীরে উপস্থিতির দুর্লভ এক স্মৃতির রোমন্থন করেছেন লেখক ও গবেষক ড. অনিন্দ্য কান্তি বিশ্বাস।
মান্না দের শেষ জীবন ও অপ্রকাশিত কিছু কথা
লেখক ড. অনিন্দ্য কান্তি বিশ্বাস গত বছর বাংলাদেশের একটি জাতীয় দৈনিকের ঈদ সংখ্যায় মান্না দের শেষ সাক্ষাৎকার নিয়ে একটি সুবিশাল প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন। ‘চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছি বারবার, সফলও হয়েছি’ শিরোনামের ১ মে ২০১৩ সালে মান্না দের শেষ জন্মদিনে নেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছিল তাঁর জীবনের না বলা অনেক গল্প।
উত্তর কলকাতার হেঁদুয়ার ৯ মদন ঘোষ লেনের পৈতৃক ভিটায় কেটেছে তাঁর শৈশব। ছোটবেলায় ফুটবল খেলায় পারদর্শী মান্না দে খ্যাপাটে স্বভাবের হলেও জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে ছিলেন আপসহীন। আক্ষেপ করে তিনি বলে গেছেন, বারবার পেছন ফেরার প্রবণতা বাঙালি জাতিকে অধঃপতনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বর্তমান প্রজন্মে সময়ের মূল্য ও প্রকৃত শিক্ষকের অভাবের কারণে অপরাধপ্রবণতা বাড়ার আশঙ্কার কথাও তিনি জানিয়েছিলেন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে বেঙ্গালুরুতে মেয়ে সুমিতা দের আশ্রয়ে অত্যন্ত নিঃসঙ্গ সময় কাটাতে হয়েছিল এই সুরের সম্রাটকে।
২০০৯ সালে বাংলা একাডেমিতে কিংবদন্তির পদার্পণ
শিল্পী মান্না দের বাংলাদেশ সফর ও ২০০৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমিতে তাঁর আগমনের স্মৃতি রোমন্থন করে লেখক জানান, সে বছর অমর একুশে গ্রন্থমেলা চলাকালে মান্না দে ও তাঁর সহধর্মিণী সুলোচনা দেবী এসেছিলেন বাংলা একাডেমিতে। তৎকালীন মহাপরিচালক ড. সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদসহ একাডেমির কর্মকর্তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনায় সিক্ত হন তিনি।
বাংলা একাডেমির প্রেস ভবন (কবি জসীমউদ্দীন ভবন) ও সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সভাগৃহে অনুষ্ঠিত সেই ঘরোয়া আড্ডায় মান্না দে বাংলা গান, সংগীতের মান এবং তৎকালীন বিনোদন মাধ্যম নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে সুনির্দিষ্ট সংগীতের চেয়ে শুধু নাচ আর কৃত্রিমতার ছড়াছড়ি। তবে এপার বাংলার গান ও ব্যান্ড সংস্কৃতির প্রশংসা করতে গিয়ে তিনি শিল্পী নচিকেতার বুদ্ধিমত্তা ও প্রতিভার কথা সপ্রশংস উল্লেখ করেছিলেন।
যে গানগুলো আজও আমাদের বাঁচিয়ে রাখে
‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’, ‘যদি হিমালয় আল্পসের’, ‘ললিতা ওকে আজ চলে যেতে বল না’, ‘সবাই তো সুখী হতে চায়’ কিংবা ‘তীর ভাঙা ঢেউ আর ঝড়ের পসরা’—মান্না দের এমন শত শত কালজয়ী গান আজও বাঙালির সুখ-দুঃখের একমাত্র সঙ্গী।
কাকা কৃষ্ণচন্দ্র দের কাছে ক্ল্যাসিকাল সংগীতে তালিম নেওয়া মান্না দে ভারতীয় সংগীত জগতে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন সুরের গভীরে নিখুঁত সাধনার জন্য। জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও তিনি মানুষের অন্তহীন ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন। মান্না দের প্রয়াণবার্ষিকীতে তাঁর সেই অমলিন সুর ও স্মৃতিচারণ আজও নতুন প্রজন্মের মনে করিয়ে দেয়—ভালো গান কভু পুরোনো হয় না, বরং সময় পেরিয়ে তা হয়ে ওঠে আরও বেশি শাশ্বত ও গভীর।


