অন্যান্য

ঢাকার পিচে হারিয়ে যাচ্ছে মহীনের ঘোড়া: জীবনানন্দের কবিতার পঙক্তি ও এক গাড়িচালকের টিকে থাকার লড়াই

দৈনিক পূর্বাচল

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

প্রকাশিত: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জীবনানন্দ দাশের কবিতার মহীনের ঘোড়াগুলো এখন ঢাকার ফুলবাড়িয়া মোড়ে। পৈতৃক পেশা টিকিয়ে রাখতে লড়াই করা ঘোড়ার গাড়িচালক আকাশের জীবনসংগ্রাম ও ঢাকার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের গল্প।

জীবনানন্দ দাশের কবিতার সেই ‘মহীনের ঘোড়াগুলো’ এখন আর নিওলিথ জ্যোৎস্নায় ঘাস খায় না; বরং আধুনিক ঢাকার পুরনো ফুলবাড়িয়া মোড়ের ওভারপাসের নিচে, যান্ত্রিক কোলাহল আর পেটের ধান্দার ভিড়ে তারা ক্লান্ত জীবন পার করে। গুলিস্তান থেকে সদরঘাট পর্যন্ত ঘোড়ার গাড়ি টেনে নিয়ে যাওয়া এই শীর্ণ ঘোড়াগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক জীবন্ত ইতিহাস। আর এই ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন ঢাকার ঘোড়ার গাড়ির মালিক ও চালক ‘আকাশ’।

পৈতৃক পেশা টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম:

পুরান ঢাকার নাজিরাবাজারে জন্ম নেওয়া আকাশের বয়স কম হলেও ১৮ বছর ধরে তিনি এই ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তার বাবার আমল থেকেই গুলিস্তান-সদরঘাট রুটে এই ঐতিহ্যবাহী বাহনটি চলে আসছে। বর্তমানে আনন্দবাজার এলাকায় স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে আকাশের ছোট সংসার।

চারটি ঘোড়া আর দুটি ঘোড়ার গাড়ির মালিক হলেও বর্তমান যান্ত্রিক যুগে এই পেশা দিয়ে সংসার চালানো তার জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। প্রতি মাসে কেবল ঘোড়ার খাবার ও আনুষঙ্গিক খরচ বাবদই ১ হাজার ২০০ টাকার বেশি ব্যয় হয়। এর সঙ্গে রয়েছে গাড়ির হেলপারের বেতন। বর্তমান বাজারে জিনিসপত্রের উচ্চমূল্য এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার আগ্রাসনে ধীরগতির এই বাহনে চড়তে চান না যাত্রীরা।

আকাশ আক্ষেপ করে বলেন, “একটা সময় ছিল যখন এই ঘোড়ার গাড়ি চালাইয়া আমরা ভালোভাবে দিন পার করতে পারতাম। কিন্তু এহন আর এইটা সম্ভব না। যাত্রী কমতাসে, বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়তি; এই অবস্থায় আমরা চলুম কেমনে?”

বদলে যাওয়া ঢাকা ও ইতিহাসের সাক্ষী:

ক্লাস টেন পর্যন্ত পড়াশোনা করার পর পেটের টানে বাবার এই পৈতৃক পেশায় নাম লেখান আকাশ। ইতিহাসের বইয়ে ঢাকার ঘোড়ার গাড়ি সম্পর্কে পড়ার পর নিজেও এর চালকের আসনে বসেছেন। তবে তার আশঙ্কা, ঢাকার ইতিহাসের সঙ্গে মিশে থাকা এই ঘোড়া ও ঘোড়ার গাড়ি হয়তো একদিন বিলীন হয়ে যাবে এবং জীবিকার তাগিদে তাদের অন্য পেশা বেছে নিতে হবে।

শহরটাকে কেমন দেখতে চান—এমন প্রশ্নের জবাবে আকাশ বলেন, “এহানে যদি মানুষের ভিড়ভাট্টা কম থাকত, রাস্তায় যানবাহনের উপ্রে নিয়ন্ত্রণ থাকত আর মানুষজন যদি এত অস্থির না হইত তাইলে শহরটা সুন্দর লাগত। আগে তো এমনই আছিল আমাগো ঢাকা।”

দিনশেষে রাতের গভীরে যখন পুরো শহর কিছুটা নীরব হয়ে আসে, তখন ওভারপাসের নিচে রুগ্‌ণ ঘোড়াগুলো পা ঠোকে, ডেকে ওঠে। তখন মনে হয়, মহীনের এই ঘোড়াগুলো বুঝি এই আধুনিক শহরের ইতিহাসের শরীরে এক জীবন্ত স্মারক হয়ে লগ্ন হয়ে আছে।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment