অন্যান্য

মোবাইল ও গেমিংয়ের নেশা: সারাদেশে শিশুদের চোখে নীরব মহামারী, বাড়ছে রোগীর ভিড়

নিজস্ব প্রতিবেদক: হাতে ট্যাব কিংবা স্মার্টফোন—আর স্ক্রিনের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকা ৫ থেকে ১৫ বছরের শিশু-কিশোররা। ঘরের কোণে কিংবা পড়ার টেবিলে এই দৃশ্য এখন দেশের প্রায় প্রতিটি পরিবারের। তবে বিনোদনের এই মাধ্যমটিই যে কোমলমতি শিশুদের ঠেলে দিচ্ছে এক অন্ধকারের দিকে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে হাসপাতালগুলোর বারান্দায় চোখ রাখলেই। অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার এবং অনলাইন গেমের নেশায় সারাদেশে শিশু-কিশোরদের মধ্যে চোখের নানা জটিল রোগ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ রূপ নিয়েছে যে, একে বর্তমান প্রজন্মের জন্য এক ধরণের ‘নীরব মহামারী’ হিসেবে অভিহিত করা চলে।

বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে উপচে পড়া ভিড়

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিশেষায়িত ও খ্যাতনামা চক্ষু ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিদিন অন্তত সাতশ থেকে সহস্রাধিক শিশু চোখের বিভিন্ন জটিল চিকিৎসা নিতে ভিড় করছে। এর একটি বড় অংশের বয়স ৫ থেকে ১২ বছরের মধ্যে। অভিভাবকদের একটি বড় অংশের অভিযোগ, সামান্য খাবার খাওয়ানো থেকে শুরু করে শিশুকে শান্ত রাখতে কিংবা নিজেদের ব্যস্ততার ফাঁদে তারা সহজেই হাতে তুলে দিচ্ছেন মোবাইল ফোন। আর এই সুযোগেই ভিডিও বা অনলাইন গেমের নেশায় বুঁদ হয়ে নষ্ট হচ্ছে শিশুদের চোখের স্বাভাবিক আলো।

কোন ধরনের সমস্যায় ভুগছে শিশুরা?

চক্ষু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের নীল আলোতে (Blue Light) থাকার কারণে শিশুদের চোখে মারাত্মক সব জটিলতা দেখা দিচ্ছে:

  • মায়োপিয়া বা দূরদৃষ্টির অভাব: অল্প বয়সেই শিশুদের চোখে ভারী চশমার ব্যবহার বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ছে। দূর থেকে জিনিস পরিষ্কার দেখতে না পাওয়ার সমস্যা এখন ঘরে ঘরে।

  • ডিজিটাল আই স্ট্রেন (Digital Eye Strain): একটানা গেম খেলার ফলে চোখের পেশী ক্লান্ত হয়ে পড়ছে, চোখ লাল হওয়া, ব্যথা করা এবং মাথাব্যথার সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

  • চোখের জল শুকিয়ে যাওয়া (Dry Eye Syndrome): স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকার সময় চোখের পলক ফেলার হার স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কমে যায়। এর ফলে কর্নিয়ায় শুষ্কতা দেখা দিচ্ছে, যা পরবর্তীতে স্থায়ী দৃষ্টিহুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

গেমের নেশা ও অভিভাবক মহলের দুশ্চিন্তা

মনোরোগ ও শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফ্রি ফায়ার, পাবজি কিংবা বিভিন্ন ভার্চুয়াল গেমের প্রতি তীব্র আসক্তি তৈরি হয়েছে কিশোরদের মধ্যে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অন্ধকার ঘরে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে তারা কেবল চোখই হারাচ্ছে না, মানসিকভাবেও খিটখিটে ও একাকী হয়ে পড়ছে। মাঠের খেলাধুলা ও সামাজিক মেলামেশার অনুপস্থিতি এই আসক্তিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা ও করণীয়

চিকিৎসকদের মতে, কেবল চোখের ড্রপ বা চশমা দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন ব্যাপক সামাজিক ও পারিবারিক সচেতনতা: ১. স্ক্রিন টাইম সীমিত করা: আমেরিকান একাডেমি অফ পেডিয়াট্রিক্সের নির্দেশনা অনুযায়ী, ২ বছরের কম বয়সীদের স্ক্রিন থেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখা এবং ৫-১২ বছরের শিশুদের ক্ষেত্রে দৈনিক বিনোদনমূলক স্ক্রিন টাইম এক ঘণ্টার নিচে রাখা উচিত। ২. ‘২০-২০-২০’ নিয়ম মানা: প্রতি ২০ মিনিট পরপর স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে অন্তত ২০ ফুট দূরের কোনো বস্তুর দিকে ২০ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকার অভ্যাস করা। ৩. বহিঃঅঙ্গনের খেলাধুলা বাড়ানো: শিশুদের উন্মুক্ত মাঠে খেলাধুলা ও প্রাকৃতিক আলোর সংস্পর্শে আসার সুযোগ করে দেওয়া, যা চোখের স্বাভাবিক বিকাশে দারুণভাবে সাহায্য করে।

সময়মতো সচেতন না হলে এই মোবাইল ও গেমিং আসক্তি আগামী দিনে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এক বিশাল স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে ফেলে দেবে—এমনটাই আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment