অন্যান্য

আমরা কি হারাচ্ছি মানসিক সুস্থতা?

নিজস্ব প্রতিবেদক

দৈনিক পূর্বাচল

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসহিষ্ণুতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সামাজিক ভারসাম্যহীনতা নিয়ে বিশেষ সংবাদ বিশ্লেষণ প্রকাশ করল দৈনিক পূর্বাচল।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অকথ্য ভাষার যথেচ্ছ ব্যবহারের প্রবণতা দিন দিন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে। অপরের ওপর জোর করে নিজস্ব মত চাপিয়ে দেওয়ার এই সংস্কৃতি প্রমাণ করছে সমাজ থেকে ধীরে ধীরে মানসিক সুস্থতা ও পারস্পরিক সহনশীলতা কমে যাচ্ছে। অথচ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আর ভাষার যথেচ্ছ ব্যবহার এক বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে সংযম, দায়িত্ববোধ ও অন্যের মর্যাদার প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধা।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, দেশের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন দ্রুতগতিতে এগিয়ে গেলেও সমাজের মূল্যবোধ, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা একই গতিতে বিকশিত না হওয়ায় সামগ্রিক ভারসাম্যে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

উন্নয়নের গতি বনাম সামাজিক সক্ষমতা

সাবেক সচিব ও কলামিস্ট মাহবুব আহমেদের এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, দেশের অর্থনীতির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে সমাজ পুরোপুরি তাল মেলাতে পারছে না। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের সঙ্গে এক আলোচনা স্মরণ করে তিনি উল্লেখ করেন, দ্রুত উন্নয়ন অনেক সময় সমাজের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে যদি সমাজ তা ধারণ করতে প্রস্তুত না থাকে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন এবং বেসরকারি খাতের প্রসারের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি জরুরি হলেও, শুধু ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ দিয়ে একটি সুস্থ জাতিসত্তা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। অবকাঠামো তৈরি তুলনামূলক সহজ হলেও দায়িত্বশীল নাগরিক ও সহিষ্ণু সমাজ তৈরি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।

শিক্ষাব্যবস্থার বিভাজন ও পরিচয়ের সংকট

বিশ্লেষণে আরও উঠে এসেছে যে, উপকরণনির্ভর উন্নয়ন কৌশল থেকে বেরিয়ে এসে দক্ষতা, জ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনভিত্তিক অর্থনীতির দিকে না গেলে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকা কঠিন। বিশেষ করে দক্ষ জাতি গঠনের মূল ভিত্তি তরুণ প্রজন্মের শিক্ষাব্যবস্থা আজ বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম ও মাদ্রাসার মতো ভিন্নধারায় বিভক্ত। এর ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মূল্যবোধ ও জীবনদৃষ্টির ব্যবধান তৈরি হয়ে সামাজিক দূরত্ব বাড়াচ্ছে।

পাশাপাশি, আয় ও স্বাস্থ্যসেবার প্রকট বৈষম্য এবং ‘বাঙালি’ বনাম ‘বাংলাদেশি’ কিংবা ‘বাঙালি মুসলমান’ পরিচয়গত নানা টানাপড়েন সমাজকে বিভক্ত করছে। বৈষম্য, দুর্বল শিক্ষা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মারমুখী ভাষার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে।

উত্তরণের পথ কী?

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু ব্যক্তিদের ভদ্র ভাষা ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল ও গণমাধ্যমসহ সব পর্যায়ে ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং নৈতিকতার চর্চা বাড়াতে হবে। সেতু বা সড়কের মতো ভৌত উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের মানসিক বিকাশ, সামাজিক আস্থা এবং নাগরিক সহিষ্ণুতাকেও উন্নয়নের সমান গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করার সময় এসেছে।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment