প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ পথচলায় কিছু দল শুধু নির্বাচনের মাঠে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তারা নিজেদের একটি রাজনৈতিক শক্তি ও ধারার পরিচায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি তেমনই একটি নাম। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর যাত্রা শুরু করা দলটি আজ প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছর উদযাপন করছে। শুরুর সময়ে দলটির সামনে ছিল একদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিভক্তির বাস্তবতা, অন্যদিকে একটি কার্যকর বহুদলীয় রাজনৈতিক পরিসরের প্রয়োজন। সেই শূন্যতার মধ্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে রাজনৈতিক কাঠামো দাঁড় করানোর উদ্যোগ নেন, পরবর্তী সময়ে সেটিই বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতির পরিবর্তনের সঙ্গেও বিএনপির ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন, নানা মতের মানুষকে একই প্ল্যাটফর্মে আনার কৌশল, মাঠপর্যায়ে সংগঠন গড়ে তোলা, পরে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গণতন্ত্রের আন্দোলন, ক্ষমতায় যাওয়া-আসা, দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতি, মামলা-জেল-নির্যাতন এবং শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালে আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসা— সব মিলিয়ে দলটির পথচলা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
যে শূন্যতা থেকে জন্ম: বিএনপির জন্মের সময় বাংলাদেশের রাজনীতি ছিল অস্থিরতাপূর্ণ। ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা ও একদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো চালু হয় এবং পরে বাকশাল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর ধারাবাহিক অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থান ও সামরিক শাসনের বাস্তবতায় দেশ নতুন এক রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করে। এমন একটি সময়ে আওয়ামী লীগের বিপরীতে একটি সুসংগঠিত, দেশব্যাপী রাজনৈতিক শক্তির অনুপস্থিতি ছিল স্পষ্ট। রাজনৈতিক পরিসর পুনর্গঠনের সেই প্রয়োজনীয়তাকে সামনে রেখে জিয়াউর রহমান জাতীয়তাবাদী রাজনীতির একটি নতুন মঞ্চ তৈরির উদ্যোগ নেন। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৭৭ সালে তিনি ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন এবং পরবর্তী সময়ে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল বা জাগদলকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক জোট গড়ে ওঠে। ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে সেই উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হয় এবং ১ সেপ্টেম্বর রমনা এলাকায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
কিন্তু বিএনপির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল— এটি একক কোনো মতাদর্শিক গোষ্ঠীর দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেনি। বিভিন্ন রাজনৈতিক পটভূমির নেতাকর্মীকে একই প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার চেষ্টা ছিল দলটির জন্মপ্রক্রিয়ার কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য। মুসলিম লীগ ঘরানার জাতীয়তাবাদী রাজনীতিক, বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নেতাসহ নানা ধারার মানুষ নতুন দলটিতে জায়গা পান। এই তালিকায় এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, শাহ আজিজুর রহমান, মওদুদ আহমদ, কাজী জাফর আহমদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তির উপস্থিতি বিএনপির বিস্তৃত রাজনৈতিক পরিসরকে তুলে ধরে। অর্থাৎ শুরুতেই বিএনপির সামনে ধারণাটি ছিল— রাজনীতিকে কোনো একটি শ্রেণি বা মতাদর্শের সংকীর্ণ সীমানায় আটকে না রেখে জাতীয়তাবাদকে কেন্দ্র করে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলা।
জাতীয়তাবাদকে রাজনৈতিক পরিচয়ে রূপ দেওয়া: জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক প্রকল্পের কেন্দ্রে ছিল ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’। বিএনপির ঘোষণাপত্রেও জাতীয় ঐক্য, গণতান্ত্রিক কাঠামো, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ও জাতীয় স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। ১৯ দফা কর্মসূচিতে কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ, জনসম্পৃক্ততা, শিল্পের বিকাশ, নারী-যুব-শ্রমজীবী মানুষের প্রয়োজন এবং গ্রামীণ উন্নয়নের মতো বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে আর্থসামাজিক রূপান্তর, স্বনির্ভরতা ও গ্রামীণ উন্নয়ন। এখানেই বিএনপির ‘জনগণের দল’ হয়ে ওঠার রাজনৈতিক বয়ানের একটি ভিত্তি তৈরি হয়। জিয়ার রাজনীতির একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল শহরকেন্দ্রিক ক্ষমতার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে গ্রাম ও সাধারণ মানুষের কাছে যাওয়া। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সফর, কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠন বিস্তার এবং উন্নয়নমূলক কর্মসূচির সঙ্গে রাজনৈতিক বার্তাকে যুক্ত করার মাধ্যমে তিনি দলের একটি বিস্তৃত সামাজিক ভিত্তি তৈরির চেষ্টা করেন।
জিয়ার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সাফল্যগুলোর একটি ছিল জাতীয় পর্যায়ের একটি দলকে দ্রুত স্থানীয় পর্যায়ে বিস্তৃত করা। বিএনপি শুধু রাজধানীর দল হয়ে থাকেনি। বিভিন্ন মত ও শ্রেণির রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে দলে যুক্ত করার ফলে সংগঠনটি দ্রুত দেশের নানা অঞ্চলে বিস্তার লাভ করে। ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বড় জয় ছিল সেই সাংগঠনিক বিস্তারের প্রথম বড় নির্বাচনী স্বীকৃতি। জিয়ার রাজনৈতিক ধরনও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শুধু বক্তৃতার রাজনীতির ওপর নির্ভর করেননি; মাঠে গিয়ে সংগঠন তৈরির ওপর জোর দিয়েছেন। এ কারণে বিএনপির রাজনীতিতে শুরু থেকেই ‘মাঠ’ একটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ। পরে দলটির নির্বাচনভিত্তিক শক্তি, আন্দোলনের সক্ষমতা এবং গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত সাংগঠনিক উপস্থিতির পেছনে সেই প্রাথমিক বিনিয়োগের প্রভাব দেখা যায়।
জিয়ার মৃত্যুর পরও ভাঙেনি দল: ১৯৮১ সালে চট্টগ্রামে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছিল— তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও নেতৃত্বনির্ভর দলটি কি টিকে থাকবে? কিন্তু এখানেই বিএনপির দ্বিতীয় রাজনৈতিক পরীক্ষা শুরু হয়। জিয়ার মৃত্যুর পর খালেদা জিয়া রাজনীতির কেন্দ্রভাগে উঠে আসেন। এর আগে তিনি ছিলেন মূলত গৃহবধূ। স্বামীর মৃত্যুর পর পরিস্থিতি তাকে রাজনীতির সামনের সারিতে নিয়ে আসে। পরে তিনি বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং ধীরে ধীরে দলের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেন। এরপর বিএনপির সঙ্গে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক পরিচয় এমনভাবে একীভূত হয় যে, দলটির দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন তিনি। এর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল এরশাদবিরোধী আন্দোলন। দীর্ঘ আন্দোলন, জোট রাজনীতি ও গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ১৯৯০ সালের শেষদিকে এরশাদ সরকারের পতন হলে নতুন করে নির্বাচনী গণতন্ত্রের পথ তৈরি হয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি আসন পেয়ে সংসদের বৃহত্তম দল হয় এবং খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হন।
একাধিকবার ক্ষমতা, তবু শেষ হয়ে যায়নি রাজনৈতিক পথ: ১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক সংকট, ক্ষমতা ছাড়ার বাধ্যবাধকতা এবং পরবর্তী নির্বাচনী পরাজয়ের পরও বিএনপি ভেঙে পড়েনি; বরং বিরোধী রাজনীতির মধ্য দিয়ে দল আবার সংগঠিত হয়েছে। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ১৯৩টি আসন পেয়ে বড় বিজয় অর্জন করে এবং খালেদা জিয়া আবার প্রধানমন্ত্রী হন। নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ওই নির্বাচনে বিএনপি ৪০.৯৭ শতাংশ ভোট পায়। খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত নির্বাচনী জনপ্রিয়তাও দলটির বিস্তৃত সামাজিক ভিত্তির একটি প্রতিফলন ছিল। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত পাঁচটি জাতীয় নির্বাচনে তিনি ২৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রতিটিতেই জয়ী হন, যা বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে বিরল একটি রেকর্ড।
তবে বিএনপির ইতিহাস শুধু সাফল্যের নয়। বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বিষয় বারবার ফিরে আসে— ক্ষমতা হারালেও দলটির সংগঠন পুরোপুরি বিলীন হয়নি। নেতৃত্বের ওপর চাপ এসেছে, কেন্দ্রীয় নেতারা গ্রেপ্তার হয়েছেন, মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, দলটি সাংগঠনিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে; কিন্তু নেতাকর্মীরা দলটির সঙ্গে থেকেছেন। বিএনপির ইতিহাসে ২০০৮ থেকে ২০২৪— এ দীর্ঘ সময়টি ছিল তেমনই একটি পরীক্ষা। আর সে পরীক্ষার ফল দেখা যায় ২০২৬ সালের নির্বাচনে। প্রায় দুই দশক পর বিএনপি বিপুল বিজয় নিয়ে আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসে।
কেন বিএনপি ‘জনগণের দল’: ‘জনগণের দল’— এটি রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ কোনো অভিধা নয়; এটি বিএনপির নিজের রাজনৈতিক পরিচয় এবং সমর্থকদের দীর্ঘদিনের বিশ্বাস। তবে এ দাবির পেছনে কিছু বাস্তব রাজনৈতিক কারণও রয়েছে। প্রথমত, বিএনপি জন্ম থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক মত ও শ্রেণির মানুষকে এক প্ল্যাটফর্মে আনার চেষ্টা করেছে। দ্বিতীয়ত, দলটির মূল রাজনৈতিক দর্শন জাতীয়তাবাদকে কেন্দ্র করে একটি বিস্তৃত সামাজিক জোট তৈরি হয়েছে। তৃতীয়ত, দলটি দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থেকেও দেশ জুড়ে একটি সাংগঠনিক কাঠামো ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। চতুর্থত, ১৯৯১, ২০০১ এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালের নির্বাচনী ফল দেখিয়েছে, বিএনপি একাধিক ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন সংগঠিত করতে পেরেছে।
অবশ্য ‘জনগণের দল’ হিসেবে বিএনপির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখন ক্ষমতায় থাকার সময়েই। বিরোধী অবস্থায় জনগণের আকাঙ্ক্ষার কথা বলা তুলনামূলক সহজ; ক্ষমতায় থেকে সে প্রত্যাশা পূরণ করা অনেক কঠিন। আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্য, প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার ও রাজনৈতিক সহনশীলতা— এসব প্রশ্নে আগামী দিনের কর্মক্ষমতাই নির্ধারণ করবে বিএনপি সত্যিকার অর্থে কতটা জনগণের দল হয়ে উঠতে পারে।


