প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬
দরজার দিকে তাকিয়ে থাকা মায়ের অনন্ত অপেক্ষার শেষ নেই। বছরের পর বছর পার হলেও সন্তান জানে না বাবা কোথায়। প্রিয়তমা স্ত্রী নিশ্চিত নন, স্বামী বেঁচে আছেন নাকি হারিয়ে গেছেন অন্ধকারের অতল গহিনে। নিখোঁজ মানুষটির স্মৃতি আঁকড়ে দিন গুনতে থাকে পুরো পরিবার। মৃত্যুর সংবাদেও একসময় কান্না থামে। স্বজনরা নতুন করে স্বপ্ন বোনে। সেখানে গুমের অপেক্ষা অন্তহীন। যার কোনো কিনারা নেই। গুম শুধু একজন মানুষকে চোখের আড়াল করে না, তৈরি করে বুকভরা অসীম শূন্যতা। ভুক্তভোগীরা দ্বারে দ্বারে একটাই প্রশ্ন ছুড়ে দেন— আমার স্বজনটি কোথায়?
আজ রবিবার আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে সেই অসংখ্য অপেক্ষমাণ চোখের কাছে সত্য, বিচার ও ফিরে পাওয়ার অধিকার দাবি করার দিন। এমন সময় দিবসটি পালিত হচ্ছে, যখন গুমের অন্ধকার অধ্যায় পেরিয়ে নতুন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হাজারো মানুষকে গুম করে যারা বিচারহীনতার সংস্কৃতি চালু করেছিল, তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে।
জানতে চাইলে গুম-সংক্রান্ত অনুসন্ধান কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী আগামীর সময়কে বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের করা অর্ডিন্যান্সে গুম কমিশনের সুপারিশের অনেক কিছুই বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। তবে বর্তমান সরকার চাইলে অর্ডিন্যান্সের সংশোধন করতে পারত। তা না করে ২০০৯ সালের আইনে ফিরে গেছে। এটা কখনো কাম্য ছিল না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাষ্ট্রযন্ত্র প্রায়ই ভুক্তভোগীদের অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করত, যাতে এসব কর্মকাণ্ডকে ন্যায্যতা দেওয়া যায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে ‘মানবিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন ও দানবায়িত’ করা হয়েছিল, যাতে এসব কাজ সহজে সম্পন্ন হয়। তবে গুম মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর।
গুমের অভিযোগ তদন্তে গঠিত গুম-সংক্রান্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে ভয়াবহ তথ্য। কমিশন পেয়েছে ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ। গুমের পর ৩৬ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। এখনো নিখোঁজ ২৫১ জন। কমিশনের সদস্যদের ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। তাদের মতে, ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার মানুষ জোরপূর্বক গুমের শিকার হয়ে থাকতে পারে। কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১ হাজার ৫৬৪টি গুমের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৬ সালে সর্বোচ্চ ২১৫টি, ২০১৭ সালে ১৯৪টি, ২০১৮ সালে ১৯২টি, ২০১৯ সালে ১১৮টি, ২০২২ সালে ১১০টি এবং ২০২৩ সালে ৬৫টি গুমের ঘটনা পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে গুমের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের কথা বলা হয়েছে। নির্বাচনের আগে গুমের ঘটনা বেড়ে যেত। বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকরাই ছিলেন প্রধান লক্ষ্য। রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া ৯৪৮ জনের মধ্যে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। এখনো নিখোঁজদের ৬৮ শতাংশই বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের সদস্য বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের অন্তত ৩১২ নেতাকর্মী গুমের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১০৭ জন আর ফেরেননি। তদন্তে তৎকালীন সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ার কথাও জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে গুমের ঘটনার সঙ্গে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের সম্পৃক্ততার অভিযোগও তদন্তে এসেছে। একই সঙ্গে একটি কেন্দ্রীয় কমান্ড কাঠামোর অস্তিত্বেরও প্রমাণ মিলেছে। এ অবস্থায় শুধু যারা সরাসরি গুমের ঘটনায় জড়িত, তাদের বিচারের আওতায় আনলেই হবে না। নির্দেশদাতা, পরিকল্পনাকারী এবং কমান্ড কাঠামোর দায়িত্বশীলদেরও জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
‘অধিকার’-এর নির্বাহী পরিচালক নাসির উদ্দীন এলান আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়ার বর্তমান রূপ সংশোধন করা প্রয়োজন। খসড়াটি জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে। একই সঙ্গে এটি ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুতর বাধা সৃষ্টি করতে পারে। সরকারের উচিত খসড়াটি পুনর্বিবেচনা করে ভুক্তভোগীদের অধিকার, স্বাধীন তদন্ত, কার্যকর প্রতিকার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
এদিকে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নতুন করে একটি গুমের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছেন মানবাধিকার কর্মীরা। তারা বলছেন, গত ১০ এপ্রিল বাগেরহাটের মোংলার জয়মনি এলাকা থেকে মিরাজ শেখ নামের এক জেলে এবং মোটরসাইকেলচালক অপহরণের ঘটনা ঘটে। মিরাজকে খুঁজে বের করে আদালতে হাজির করার নির্দেশও দিয়েছেন হাইকোর্ট। তবে ১৪০ দিনেও খোঁজ মেলেনি মিরাজের। স্বজনদের অভিযোগ, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার পরিচয়ে সাদা পোশাকে তাকে উঠিয়ে নেওয়া হয়। স্পিডবোটে করে দ্বিগরাজের কোস্ট গার্ড বেজ ক্যাম্পের দিকে নেওয়া হয় মিরাজকে।
গুমের শিকার হওয়া ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসিনুর রহমান বলেছেন, ‘বর্তমান আইন অনুযায়ী যিনি মামলা করবেন, তাকে প্রমাণ করতে হবে তিনি গুম হয়েছিলেন। নইলে পাঁচ বছরের জেল। বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর স্ত্রী কীভাবে প্রমাণ করবেন তার স্বামী গুম হয়েছিলেন? এটা কি গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিরা প্রমাণ করতে পারবেন? রাষ্ট্র কি প্রমাণ রেখে গুম করেছিল টার্গেটকৃত ব্যক্তিদের?’
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য নতুন আইন করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পেয়েছে। তবে সেটি নিয়ে নানা বিতর্ক হচ্ছে।
গুম-সংক্রান্ত কমিশনের সাবেক সদস্য ও মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) উপদেষ্টা নূর খান লিটন আগামীর সময়কে বলেছেন, গুমকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া ইতিবাচক। তবে তদন্তের স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে আইনটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে সেই অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব আবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর থাকলে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও বিএনপির সংসদ সদস্য এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনও প্রস্তাবিত আইনটির খসড়ার সমালোচনা করেন। প্রমাণিত নয়, এমন অভিযোগের ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন তিনি। একই সঙ্গে আন্তঃসংস্থা তদন্ত ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
তিনি ইলিয়াস আলীর গুমের ঘটনা উল্লেখ করে বলেছেন, আদালতে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিনিধিরা ওই ঘটনায় তাদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছিলেন। কিন্তু তদন্তে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।
মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গুমের বিচার কোনো রাজনৈতিক প্রতিশোধ নয়। এটি রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি ও আইনের শাসনের প্রশ্ন। অতীতের গুমের বিচার না হলে ভবিষ্যতের গুম ঠেকানো কঠিন। আবার শুধু অতীতের বিচার করলেও চলবে না। এমন আইন ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে, যাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আড়ালে কোনো নাগরিককে অদৃশ্য করে দেওয়ার সুযোগ না থাকে।
ভুক্তভোগীরা বলেছেন, বিচার প্রক্রিয়ায় তারা দীর্ঘসূত্রতা দেখতে চান না। যারা এখনো নিখোঁজ তাদেরও সন্ধান চান দ্রুত। সবশেষ নিখোঁজ মিরাজ শেখের স্ত্রী মুক্তা বেগমের চোখেও এখন সেই অপেক্ষা। এ ছাড়া ২০১২ সালে স্বামী ফিরোজ খান কানুকে হারিয়েছেন আমেনা আক্তার বৃষ্টি। কেটে গেছে ১৪ বছর। স্বামী কোথায়, বেঁচে আছেন কি না আজও জানেন না তিনি। বৃষ্টি বললেন, ‘আমি শুধু জানতে চাই, আমার স্বামী কোথায়? তার সঙ্গে কী করা হয়েছে? যারা গুম হয়েছেন, তাদের সবার সন্ধান চাই।’
ভয়েস অব এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ার্ড পারসনসের আবদুল কাইয়ুম ২০১৭ সালে র্যাব-১১-এর হাতে তার অপহরণের ঘটনা তুলে ধরে আগামীর সময়কে বললেন, ‘রাষ্ট্রীয় হয়রানির আশঙ্কায় জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।’
বিশ্বব্যাপী গুম ও জোরপূর্বক নিখোঁজের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবাদ এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর প্রতি সংহতি প্রকাশ করতে আজকের দিনটি (৩০ আগস্ট) আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালিত হয়।


