অন্যান্য

ডোম-ইনোর ফাঁদে হাজারো পরিবার: উচ্চ আদালতের ঐতিহাসিক রায়ে লিকুইডেটর নিয়োগ

বিশেষ প্রতিবেদক, দৈনিক পূর্বাচল রাজধানীর শান্তিনগরে ‘ডোম-ইনো প্রমেসা’ প্রকল্পে ফ্ল্যাট বুকিং দিয়ে সমুদয় অর্থ পরিশোধের ১০ বছর পরও ফ্ল্যাট না পাওয়া ৭৩ জন ভুক্তভোগীর আবেদনের প্রেক্ষিতে আবাসন প্রতিষ্ঠান ‘ডোম-ইনো লিমিটেড’-এ অস্থায়ী লিকুইডেটর (অবসায়ক) নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। গত ৯ আগস্ট বিচারপতি সিকদার মাহমুদুর রাজির একক বেঞ্চ দীর্ঘ শুনানি শেষে এই মাইলফলক আদেশ দেন। রায়ে আদালত উল্লেখ করেন, নিযুক্ত লিকুইডেটর আপাতত ‘ডোম-ইনো প্রমেসা’ প্রকল্পের সমুদয় দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া, প্রতারণার শিকার অন্যান্য প্লট মালিক ও ফ্ল্যাট ক্রেতারা আদালতের শরণাপন্ন হলেও তাদের আবেদন বিবেচনা করা হবে।

আদালতের নজরে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন আবেদনকারীদের পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. নজরুল ইসলাম খান (সঙ্গে ছিলেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ জামিল খান ও অ্যাডভোকেট মাহমুদ খলিল)। শুনানিকালে আইনজীবীরা দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত দুটি অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন—‘ডোম-ইনোর ফাঁদে বন্দি হাজারো পরিবারের স্বপ্ন’ ও ‘ডোম-ইনোর ভয়ংকর প্রতারণা: কেউ নিঃস্ব, কারো কারো মৃত্যু’সহ একাধিক জাতীয় দৈনিক ও অনলাইন পোর্টালের সংবাদ আদালতের নজরে আনেন। আদালত এসব প্রতিবেদন ও বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও ইংল্যান্ডের বিভিন্ন আইনি রেফারেন্স বিবেচনায় নিয়ে এই রায় দেন।

লিকুইডেটরের কাজ ও কার্যপরিধি কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট মো. নজরুল ইসলাম খান জানান:

  • লিকুইডেটর বা অবসায়ক হলেন আদালত কর্তৃক মনোনীত এমন কর্মকর্তা, যিনি দেউলিয়া বা বন্ধ হওয়া কোম্পানির সম্পত্তি বিক্রি করে ঋণ ও পাওনা পরিশোধের আইনি দায়িত্ব পালন করেন।

  • তিনি কোম্পানির সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেবেন, তা বিক্রি করে নগদ অর্থে রূপান্তর করবেন এবং পাওনাদার, ব্যাংক ও ভুক্তভোগীদের ঋণ মেটাবেন।

  • দেনা পরিশোধের পর উদ্বৃত্ত অর্থ থাকলে তা শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে বণ্টন করবেন।

  • সার্টিফাইড কপি পাওয়ার পরই অবসায়ক দায়িত্ব নেবেন এবং ভুক্তভোগী প্লট মালিক ও ক্রেতারা নিজ নিজ ফ্ল্যাটের আইনি নিবন্ধন নেওয়ার সুযোগ পাবেন।

প্রতারণার ভয়াবহচিত্র ও শত শত পরিবারের আকুতি অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডোম-ইনোর প্রতারণায় অন্তত ৮০ জন জমির মালিক ও শত শত ফ্ল্যাট ক্রেতা নিঃস্ব হয়েছেন। চুক্তি অনুযায়ী ৩ বছরের মধ্যে ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও ১০-২০ বছর ধরে অনেক প্রকল্প পরিত্যক্ত বা শুধু কাঠামো অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে।

  • অঙ্গীকারনামা ভঙ্গ ও অতিরিক্ত অর্থ দাবি: সেনপাড়ার ‘ডোম-ইনো প্রোভিস্তা’ প্রকল্পে ২০১২ সালে টাকা দিয়ে ২০১৫ সালে ফ্ল্যাট পাওয়ার কথা থাকলেও কাজ শেষ করা হয়নি। উল্টো কোম্পানি চুক্তি ভঙ্গ করে গ্রাহকদের ‘বিলম্ব ফি’ দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করছে। (যেমন: ১ কোটি ৮৮ লাখ টাকার ফ্ল্যাটে ৮০ লাখ টাকা পরিশোধ করার পরও নতুন করে আরও ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা দাবি করা হয়েছে)।

  • বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে মানবেতর জীবনযাপন: শান্তিনগরের ‘ডোম-ইনো প্রমেসা’ প্রকল্পে ক্রেতারা যাতে নিজেরা কাজ শেষ করতে না পারেন, সেজন্য কোম্পানি বিদ্যুৎ অফিসে চিঠি দিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করিয়ে দেয়। ফলে বসবাসকারী পরিবারগুলো প্রায় এক বছর ধরে বিদ্যুৎহীন অবস্থায় মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন।

পলাতক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ঝুলছে ডজন ডজন পরোয়ানা ডোম-ইনোর মালিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আব্দুস সালামের বিরুদ্ধে অন্তত ১৩৬টি মামলা বিচারাধীন। ইতিমধ্যে একটি মামলায় তার চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং দুটি আরবিট্রেশন মামলায় প্রায় ৩৯ কোটি ৪২ লাখ টাকা জরিমানা হয়েছে। ১৭টিরও বেশি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে তিনি এবং কোম্পানির চেয়ারম্যান রিজওয়ানা ইসলাম বর্তমানে পলাতক। তারা যেন দেশ ছেড়ে পালাতে না পারেন, সেজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জোর নজরদারি দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment