দাদাগিরির বিরোধিতায় রাশিয়া ও চীনের ঐকমত্য

একতরফা দাদাগিরি মানবে না রাশিয়া ও চীন। এর বিরোধিতা করতে চীন ও রাশিয়াকে দৃঢ়ভাবে দায়িত্বশীল বৃহত্ শক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করতে হবে বলে জানিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। বেইজিং সফররত রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর প্রেসিডেন্ট শি এই কথা জানান। দুই দেশ বিশ্ব জুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের কড়া সমালোচনা করেন। রাশিয়া ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন সম্প্রতি চীন-রাশিয়ার মধ্যে কৌশলগত সমন্বয় আরো জোরদার করা এবং সুপ্রতিবেশী ও বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা গভীরতর করার বিষয়ে যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন। তারা বাণিজ্য, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং অন্যান্য বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আরো প্রায় ২০টি নথিতে স্বাক্ষর করেন। প্রেসিডেন্ট পুতিনের এক সহযোগী জানিয়েছেন, রাশিয়া ও চীন ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া ২’ গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প নিয়ে একটি সাধারণ সমঝোতায় পৌঁছেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রাশিয়া থেকে প্রতিবছর সর্বোচ্চ ৫০ বিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস চীনে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

চীন ও রাশিয়ার কর্মকর্তারা বাণিজ্য, প্রযুক্তি, মেধাস্বত্ব এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে একাধিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। সমঝোতায় স্বাক্ষরের পর চীনের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, চীন ও রাশিয়ার সম্পর্ক ক্রমশ উন্নত হয়েছে এবং তা এখন সর্বোচ্চ স্তরের সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারিত্বে পৌঁছেছে। তিনি বলেন, দুই দেশ সমান মর্যাদার ভিত্তিতে পারস্পরিক সম্মানের সঙ্গে একে অপরের সঙ্গে আচরণ করেছে। তার দাবি, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এখন একটি নতুন সূচনা বিন্দুতে পৌঁছেছে। শি বলেন, চীন ও রাশিয়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরো বাড়াবে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার রক্ষা এবং সব ধরনের একতরফা দাদাগিরি ও ইতিহাসকে উলটে দেওয়ার প্রচেষ্টা বিরোধিতা করতে চীন ও রাশিয়াকে দৃঢ়ভাবে দায়িত্বশীল বৃহত্ শক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের সমালোচনা

রাশিয়া ও চীনের যৌথ বিবৃতিতে বিশ্ব জুড়ে বিভিন্ন ধরনের সামরিক কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানানো হয়েছে এবং এর মাধ্যমে গত ছয় মাসে ইরান ও ভেনিজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। শি ও পুতিন উল্লেখ করেছেন, অন্যান্য দেশের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ সামরিক হামলা, এমন হামলার প্রস্তুতি নেওয়ার আড়াল হিসেবে ভণ্ডামিপূর্ণভাবে আলোচনার ব্যবহার, সার্বভৌম রাষ্ট্রের নেতাদের হত্যাকাণ্ড, এসব রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করা, শাসন পরিবর্তনের উসকানি এবং জাতীয় নেতাদের প্রকাশ্য অপহরণ করে বিচারের মুখোমুখি করা। তাদের মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড জাতিসংঘ সনদের উদ্দেশ্য ও নীতিমালা, আন্তর্জাতিক আইন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নিয়মগুলোকে গুরুতরভাবে লঙ্ঘন করে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা বিশ্বব্যবস্থার ভিত্তির অপূরণীয় ক্ষতি করে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদকালে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে শি ও পুতিন নিজেদের ক্রমশ একটি নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অগ্রদূত হিসেবে উপস্থাপন করছেন।

যৌথ বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পিত গোল্ডেন ডোম প্রকল্প এবং মহাকাশে অস্ত্র স্থাপনের সম্ভাবনারও নিন্দা জানানো হয়েছে। গোল্ডেন ডোম ব্যবস্থাটি ইসরাইলের পরিচিত আয়রন ডোম মডেলের ভিত্তিতে তৈরি এবং শুরুতে ‘আইরন ডোম অব আমেরিকা’ নামে পরিচিত ছিল। এটি একটি পরিকল্পিত বহুস্তরীয় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা শত্রুপক্ষের ব্যালিস্টিক, হাইপারসনিক এবং ক্রুজ মিসাইল শনাক্ত করে ধ্বংস করতে সক্ষম হবে। তবে ইসরাইলের আয়রন ডোমের তুলনায় গোল্ডেন ডোম পুরো পৃথিবীকে অন্তর্ভুক্ত করবে, যা কক্ষপথে অবস্থানরত কয়েক হাজার উপগ্রহের সমন্বয়ে পরিচালিত হবে। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এ ধরনের প্রযুক্তি কৌশলগত স্থিতিশীলতার জন্য স্পষ্ট হুমকি তৈরি করে।

হরমুজ নিয়ে যে ইঙ্গিত দিল চীন ও রাশিয়া

চীন ও রাশিয়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সরবরাহ শৃঙ্খলে ‘একতরফাভাবে’ হস্তক্ষেপ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কিছু নির্দিষ্ট রাষ্ট্র, আন্তঃরাষ্ট্রীয় জোট এবং তাদের মিত্রদের একতরফা পদক্ষেপ, যা আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনকে বাধাগ্রস্ত করে, তা বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের অখণ্ডতা এবং সামগ্রিকভাবে সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে। বিবৃতিতে নির্দিষ্ট করে কোনো গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নাম উল্লেখ করা হয়নি, তবে ধারণা করা হচ্ছে এটি হরমুজ প্রণালির দিকে ইঙ্গিত করছে। পাশাপাশি বলা হয়েছে, বন্দরসহ সামুদ্রিক অবকাঠামোতে সহযোগিতা বাজারভিত্তিক ও বাণিজ্যিক নীতির ওপর ভিত্তি করে হওয়া উচিত, যাতে রাজনৈতিকীকরণ এবং অতিরিক্ত নিরাপত্তা চেষ্টা এড়ানো যায়। —বিবিসি

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 0   +   6   =