ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি আগামীকালই একটি শান্তিচুক্তি ঘোষণা করে এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া হয়, তবুও যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব শেষ হবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, গোলাবর্ষণ থামলেই যুদ্ধ শেষ হয় না; বরং তা সমাপ্ত হয় তখনই, যখন বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থায় সৃষ্ট কাঠামোগত ক্ষতি ধীরে ধীরে মূল্য, চুক্তি, আর্থিক ভারসাম্য ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় প্রতিফলিত হয়ে শেষ হয়।
বিশ্লেষকরা ১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ ও ইউক্রেন যুদ্ধের উদাহরণ টেনে বলছেন, বড় সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব দশকজুড়ে চলতে পারে। একইভাবে ইরান যুদ্ধের প্রভাবও চারটি ধাপে বিশ্ব অর্থনীতিতে ধাক্কা দেবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রথম ধাপ: জ্বালানি ও খাদ্য মূল্যস্ফীতি
প্রথম ধাক্কা ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান- তেলের দাম, এলএনজি সরবরাহ, শিপিং খরচ এবং জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি। কিন্তু এটি কেবল শুরু। জ্বালানি প্রায় সব পণ্যের উৎপাদন ব্যয়ের মূল উপাদান হওয়ায় এর প্রভাব দ্রুত অন্যান্য খাতে ছড়িয়ে পড়ে।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে উৎপাদিত অ্যামোনিয়ার ওপর বৈশ্বিক সার শিল্প ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে গ্যাস সংকটের কয়েক মাসের মধ্যেই সার ও কৃষিপণ্যের দাম বেড়ে যায়। এরপর দু’টি মৌসুমের মধ্যে খাদ্যের দামও বাড়তে থাকে।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের প্রভাব শেষ পর্যন্ত মিসরের রুটি, বাংলাদেশের চালের দাম কিংবা আফ্রিকার কৃষকের সার ব্যবহারের ওপরও পড়ে।
দ্বিতীয় ধাপ: বৈশ্বিক বাণিজ্য কাঠামোর স্থায়ী পরিবর্তন
দ্বিতীয় ধাপকে বিশ্লেষকরা ‘অদৃশ্য ক্ষতি’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। যুদ্ধের সময় সরবরাহ ব্যবস্থা যেভাবে পরিবর্তিত হয়, তা পরে আর আগের অবস্থায় ফিরে যায় না।
লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালীর উদাহরণ টেনে বলা হয়, নিরাপত্তা সংকটে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে কোম্পানিগুলো বিকল্প রুটে চলে যায়। একবার নতুন রুটে বিনিয়োগ ও ব্যবস্থা গড়ে উঠলে পুরনো ব্যবস্থায় ফিরে আসা আর অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিসঙ্গত থাকে না। ফলে যুদ্ধ শেষ হলেও বিশ্ব বাণিজ্যের কাঠামোগত পরিবর্তন স্থায়ী হয়ে যায়।
তৃতীয় ধাপ: গ্লোবাল সাউথে চাপ ও বৈষম্য বৃদ্ধি
তৃতীয় ধাক্কা সবচেয়ে বেশি আঘাত হানে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। উন্নত অর্থনীতিগুলো যেখানে ভর্তুকি, রিজার্ভ মুদ্রা ও বৈচিত্র্যময় সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে সংকট সামাল দিতে পারে, সেখানে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে মুদ্রার অবমূল্যায়ন, খাদ্য ও সার রেশনিং এবং আমদানি সংকোচনের মুখে পড়তে হয়।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নিম্ন আয়ের দেশে গড়ে পরিবারের আয়ের প্রায় ৪৪ শতাংশ খাদ্যে ব্যয় হয়, যেখানে উন্নত দেশে তা ১৬ শতাংশের কাছাকাছি। ফলে খাদ্য ও জ্বালানি মূল্যস্ফীতি সরাসরি সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে।
চতুর্থ ধাপ: রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সরকার পতনের ঝুঁকি
চতুর্থ ধাক্কা সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও রাজনৈতিক। অর্থনৈতিক সংকট সরাসরি সামাজিক চুক্তিকে দুর্বল করে দেয়।
উদাহরণ হিসেবে আরব বসন্ত, শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক সংকট এবং পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অস্থিরতার কথা উল্লেখ করা হয়, যেখানে বৈশ্বিক দামের চাপ ও মুদ্রা সংকট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধের পরবর্তী মূল্যস্ফীতি এমন অনেক দেশকে আঘাত করবে যাদের ইতোমধ্যেই আর্থিক সক্ষমতা সীমিত। ফলে কিছু সরকার রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকতে ব্যর্থ হতে পারে।
আন্তর্জাতিক কাঠামোগত সংস্কারের আহ্বান
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তিনটি বড় পদক্ষেপ প্রয়োজন- যার মধ্যে রয়েছে আঞ্চলিক খাদ্য ও সার মজুত ব্যবস্থা, গ্লোবাল সাউথের জন্য যুদ্ধ-ঝুঁকি বীমা তহবিল এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নীতিগত সংস্কার।
তাদের মতে, আইএমএফ সাধারণত যুদ্ধজনিত সংকটকে সংশ্লিষ্ট দেশের নীতিগত ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচনা করে, যা অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব সংস্কার ছাড়া যুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক অভিঘাত মোকাবিলা করা উন্নয়নশীল দেশগুলোর পক্ষে কঠিন হয়ে উঠবে।
বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধ শেষ হলেও এর অর্থনৈতিক প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্বব্যাপী বহাল থাকবে। যুদ্ধের প্রকৃত বিল পরিশোধ করবে সেই দেশগুলো, যারা সংঘাতে সরাসরি জড়িত ছিল না। আর এই চাপই ভবিষ্যতের বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে। সূত্র: আল-জাজিরা

