হরমুজ নিয়ে ট্রাম্পের ডেডলাইন শেষের পথে, ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় এশিয়ার কিছু দেশ

হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরানকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়সীমা শেষ হওয়ার পথে। তবে এই সময়সীমা ঘনিয়ে আসার আগেই এশিয়ার কয়েকটি দেশ তাদের জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে তেহরানের সঙ্গে আলাদা সমঝোতায় পৌঁছেছে।
সোমবার ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দেন, মঙ্গলবার রাত ৮টা বা গ্রিনিচ সময় মধ্যরাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করতে ইরান কোনো চুক্তিতে না এলে যুক্তরাষ্ট্র ‘এক রাতেই’ দেশটিকে ধ্বংস করে দিবে।

কিন্তু এর আগেই কয়েকটি দেশ তেহরানের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে। বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো এ বিষয়ে বেশি সক্রিয়। কারণ তাদের অর্থনীতি উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার হুমকি দেওয়ার পর থেকেই এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি বৈশ্বিক উত্তেজনার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও বেড়ে গেছে।

এরই মধ্যে পাকিস্তান, ভারত ও ফিলিপাইনসহ কয়েকটি এশীয় দেশ ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছেছে, যাতে তাদের কিছু জাহাজ নিরাপদে প্রণালি পার হতে পারে। চীনও জানিয়েছে, তাদের কয়েকটি জাহাজ সাম্প্রতিক সময়ে এই পথ ব্যবহার করেছে।

ফিলিপাইন সর্বশেষ দেশ হিসেবে ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছেছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী থেরেসা লাজারো বলেন, তেহরান ফিলিপাইন পতাকাবাহী জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালিতে ‘নিরাপদ, বাধাহীন ও দ্রুত চলাচল’ নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছে। তিনি বলেন, জ্বালানি ও সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে এই চুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ফিলিপাইন তাদের মোট তেলের প্রায় ৯৮ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দেশটিতে পেট্রোলের দাম দ্বিগুণের বেশি বেড়ে গেলে তারা জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে।

পাকিস্তান গত ২৮ মার্চ জানায়, ইরান তাদের ২০টি জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি দিয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেন, এটি ইরানের একটি ইতিবাচক ও গঠনমূলক পদক্ষেপ। তার মতে, সংলাপ ও কূটনীতিই এই সংকটের একমাত্র পথ।

ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজের ক্ষেত্রেও একই ধরনের আশ্বাস দিয়েছে তেহরান। ভারতে নিযুক্ত ইরানের দূতাবাস সামাজিক মাধ্যমে জানায়, ‘আমাদের ভারতীয় বন্ধুরা নিরাপদ রয়েছে, চিন্তার কোনো কারণ নেই।’ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেন, কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলেই ভারতীয় ট্যাংকারগুলোর চলাচল সম্ভব হয়েছে।

চীন গত সপ্তাহে নিশ্চিত করেছে, সমন্বয়ের মাধ্যমে তাদের তিনটি জাহাজ সম্প্রতি হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। তবে তারা এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেয়নি।

মালয়েশিয়াও জানিয়েছে, তাদের কিছু ট্যাংকারকে তেহরান প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি দিয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এ জন্য ইরানের প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

তবে এসব সমঝোতার পরিধি কতটা এবং তা কতদিন কার্যকর থাকবে—তা নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে। শিপিং পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ম্যারিক্স্–এর দিমিত্রিস মানিয়াতিস বলেন, এই নিরাপত্তা নিশ্চয়তা সব জাহাজের জন্য প্রযোজ্য কী-না, নাকি নির্দিষ্ট কিছু জাহাজের জন্য—তা এখনও স্পষ্ট নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যেসব দেশ উপসাগরীয় জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল, তারা এখন বুঝতে পারছে যে সরবরাহ পুনরায় শুরু করতে চাইলে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা ছাড়া তাদের সামনে অন্য পথ নেই। তবে এসব চুক্তি কূটনৈতিক সফলতা হলেও এটি সংকটের স্থায়ী সমাধান নয়।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 10   +   3   =