বিশেষ প্রতিনিধি, দৈনিক পূর্বাচল
ঢাকা: জন্ম থেকে মৃত্যু— মানুষের পুরো জীবনচক্রেই ‘ঘুষ’ যেন এক সংক্রামক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। জন্মসনদ থেকে শুরু করে মৃত্যুসনদ কিংবা ওয়ারিশের কাগুজে প্রমাণপত্র, প্রতিটি সাধারণ নাগরিক সেবা পেতেই নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। নাগরিকের মৌলিক ও আইনি অধিকারের প্রায় প্রতিটি খাত এখন অনিয়ম, দুর্নীতি আর দালালের চক্রে বন্দি। ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন হয়ে উঠেছে চরম ভোগান্তিময়।
পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্র: দালাল ছাড়া অচল
একটি পাসপোর্ট বা জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধন কিংবা নতুন করে তৈরি করতে গিয়ে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন। ফরমে সামান্য ভুলের অজুহাত দেখিয়ে দিনের পর দিন ঘোরানো হলেও দালালের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা দিলেই নিমেষেই মিলছে সমাধান।
সম্প্রতি যাত্রাবাড়ী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে দেখা যায়, দালাল ছাড়া আবেদনপত্র জমা দিতে গেলে কর্মকর্তাদের নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে। ভুক্তভোগী ও দালালদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সাধারণ সমস্যা সমাধানে সরকারি ফির বাইরে ২ থেকে ৫ হাজার টাকা এবং বয়স বা বড় ধরনের সংশোধনের জন্য ৫০ হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। কদমতলী থেকে আসা সেবা প্রত্যাশী আরাফাত আবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হয়ে গেটের সামনে দালালকে ২ হাজার টাকা দেওয়ার পর সহজেই আবেদন জমা দিতে সক্ষম হন।
জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনে পদে পদে ভোগান্তি
একটি শিশুর জন্মের পর প্রথম রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ‘জন্মনিবন্ধন সনদ’। সরকারি ফি নামমাত্র হলেও, দালালের দৌরাত্ম্য আর কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে এখানেও গুনতে হচ্ছে কয়েকগুণ বাড়তি টাকা। ঢাকার মিরবাগের বাসিন্দা শাহাদাত হোসেন মহাখালী ঢাকা উত্তর সিটির আঞ্চলিক অফিসে গিয়ে কয়েকদিনে যা পারেননি, এক কম্পিউটার দোকানিকে ১২০০ টাকা দিয়ে তা একদিনেই করিয়ে নিয়েছেন।
সেবা নিতে আসা সুরাইয়া বেগম ক্ষোভের সঙ্গে বলেন,
“জন্ম থেকে শুরু করে মরার পরও যে শান্তি নেই, তা এই অফিসে না আসলে বুঝতাম না। সামান্য একটা ভুলের জন্য তিন মাস ধরে ঘুরছি। শেষ পর্যন্ত দালালের হাতে বাড়তি টাকা দেওয়ার পর কাজটা হলো।”
হাসপাতাল ও ভূমি অফিস: উপরি ছাড়া নড়ে না ফাইল
শুধু পাসপোর্ট বা জন্মনিবন্ধনই নয়, সরকারি হাসপাতালগুলোতেও চিকিৎসার প্রতিটি ধাপে (বেড বরাদ্দ, পরীক্ষা, অপারেশন বা অ্যাম্বুলেন্স) অতিরিক্ত টাকা দাবি করা হচ্ছে। এমনকি ওয়ার্ডবয়ের হাতে টাকা না দিলে মিলছে না সাধারণ বেডও।
অন্যদিকে তেজগাঁও ভূমি রেজিস্ট্রি অফিসসহ দেশের বিভিন্ন সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে জমির নামজারি (মিউটেশন), খতিয়ান সংশোধন কিংবা দলিল নিবন্ধনে প্রকাশ্যে ঘুষ নেওয়া হচ্ছে। খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী জানান, সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে তাকে কাজ শেষ করতে হয়েছে।
বিআরটিএ ও অন্যান্য সামাজিক সেবা
বিআরটিএ থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্স বা গাড়ির নিবন্ধন নিতে গেলে ঘুষ দেওয়া যেন এক অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। এছাড়া অবিবাহিত সনদ, ভূমিহীন ও দুস্থদের তালিকা, বয়স্ক-বিধবা-প্রতিবন্ধী ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, ভিজিডি, ভিজিএফ ও কাবিখা কার্ড সেবা এবং ক্ষুদ্র ঋণের সহায়তা পেতেও সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তি ও আর্থিক অনিয়মের শিকার হতে হচ্ছে।

