রামগঞ্জ (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি |
প্রকাশিত: ২৭ জুন, ২০২৬
লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে পারিবারিক কলহের জেরে স্বামী হাফিজ মোল্লার নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে সামিয়া আক্তার (২৭) নামের এক গৃহবধূর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে।
গত বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) দিবাগত রাত ২টায় ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর পর আইনি জটিলতা ও গ্রেপ্তার এড়াতে স্ত্রীর লাশ হাসপাতাল মর্গে রেখেই কৌশলে পালিয়ে গেছেন অভিযুক্ত স্বামী। এ ঘটনায় নিহতের গ্রামের বাড়িতে চরম ক্ষোভ ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
নিহত সামিয়া আক্তার রামগঞ্জ উপজেলার ৩নং ভাদুর ইউনিয়নের জয়নগর গ্রামের দেলোয়ার হোসেন বতার বড় মেয়ে। অন্যদিকে অভিযুক্ত হাফিজ মোল্লা একই এলাকার উত্তর গ্রাম মাইজের বাড়ির সিরাজ মোল্লার ছোট ছেলে।
১২ বছরের সংসারে ৩টি বিয়ে ও নিয়মিত নির্যাতন
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১২ বছর আগে সামিয়া আক্তারকে বিয়ে করেন হাফিজ মোল্লা। তবে বিয়ের পর থেকেই তাদের সংসারে অশান্তি ও কলহ লেগেই থাকত। স্বজনরা জানান, সামিয়া ছাড়াও হাফিজের আরও দুটি স্ত্রী রয়েছে। একাধিক বিয়ের কারণে এবং বিভিন্ন সময় যৌতুকের দাবিতে সামিয়ার ওপর প্রায়ই শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযুক্ত হাফিজ এলাকায় একাধিক মামলার আসামি এবং মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত। তার বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্র আইনসহ বিভিন্ন অপরাধে একাধিক মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে।
৯ দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে বিদায়
নিহতের ছোট ভাই হাসান জানান, গত ১৬ জুন পারিবারিক কলহের জেরে সামিয়াকে লাঠি ও ভারী বস্তু দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর জখম করেন হাফিজ মোল্লা। অবস্থা আশঙ্কাজনক ও অচেতন হয়ে পড়লে হাফিজ নিজেই সামিয়াকে ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান। সেখানে টানা ৯ দিন লাইফ সাপোর্টে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে গত ২৫ জুন রাত ২টায় মারা যান সামিয়া। মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হতেই হাফিজ লাশ হাসপাতাল মর্গে রেখে হাসপাতাল থেকে চম্পট দেন।
পরে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি ঢাকার শেরেবাংলা নগর থানাকে অবহিত করলে পুলিশ এসে লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে। গতকাল শুক্রবার ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
পিটিয়ে মারার পর বিষ খাওনোর অভিযোগ
স্বজনদের দাবি, সামিয়ার শরীরে একাধিক গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তাকে প্রথমে নৃশংসভাবে মারধর করা হয় এবং পরবর্তীতে ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে মুখে বিষ ঢেলে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
গতকাল শুক্রবার (২৬ জুন) এশার নামাজের পর সামিয়ার মরদেহ তার বাবার বাড়ি ভাদুর ইউনিয়নের জয়নগর গ্রামে নিয়ে আসা হলে পুরো এলাকায় এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ সময় ঘাতক স্বামী হাফিজের দ্রুত গ্রেপ্তার ও ফাঁসির দাবিতে ক্ষোভে ফেটে পড়েন এলাকাবাসী ও নিহতের স্বজনরা।
নিহতের পিতা দেলোয়ার হোসেন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,
“আমার মেয়েটা সব মুখ বুজে সহ্য করত। বিয়ের পর থেকেই হাফিজ ওর ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে আসছিল। আমি গত ২৫ জুন রামগঞ্জ থানায় একটি লিখিত অভিযোগও দিয়েছিলাম। কিন্তু আমার মেয়েটাকে আর বাঁচাতে পারলাম না। আমি এই নরপশুর ফাঁসি চাই।”
আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস পুলিশের
এ বিষয়ে রামগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ফিরোজ উদ্দিন চৌধুরী জানান, ভিকটিমের পরিবারের পক্ষ থেকে নির্যাতনের বিষয়ে আগেই থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন,
“ঢাকার শেরেবাংলা নগর থানা থেকে আমরা একটি প্রাথমিক বার্তা পেয়েছি, যেখানে একজন নারী বিষক্রিয়ায় মারা গেছেন মর্মে সুরতহাল ও পোস্টমর্টেম করার কথা উল্লেখ রয়েছে। আমরা শেরেবাংলা নগর থানাকে মূল সুরতহাল রিপোর্টসহ সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আমাদের কাছে পাঠানোর জন্য পাল্টা চিঠি পাঠিয়েছি। অফিশিয়াল নথিপত্র ও ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পেলেই এটিকে হত্যা মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করে তদন্ত সাপেক্ষে আসামিকে গ্রেপ্তারে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

