ঢালিউড ‘প্রিয়দর্শিনী’ মৌসুমীর ক্যারিয়ারের পূর্ণাঙ্গ খতিয়ান

বিনোদন ডেস্ক | 

প্রকাশিত: ২৭ জুন, ২০২৬ঢালিউডের প্রিয়দর্শিনী মৌসুমীর ৩ দশকের ক্যারিয়ারের ১৬৬টি চলচ্চিত্রের নিখুঁত তালিকা ও ইতিহাস। সালমান শাহ থেকে শুরু করে মান্না, ওমর সানী ও রিয়াজের সাথে তার সেরা সিনেমাগুলোর বিবরণসহ পড়ুন

বিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে ঢাকাই চলচ্চিত্রের আকাশে যে ক’জন মেধার দ্যুতি ছড়িয়েছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম শীর্ষ নাম মৌসুমী। দর্শক ও চলচ্চিত্র মহলে তিনি সমাদৃত ‘প্রিয়দর্শিনী’ নামে। ১৯৯৩ সালে সালমান শাহের বিপরীতে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবির মাধ্যমে রূপালী পর্দায় পা রাখা এই অভিনেত্রী দেখতে দেখতে পার করেছেন ক্যারিয়ারের তিন দশক।

আজকের বিশেষ প্রতিবেদনে দৈনিক পূর্বাঞ্চলের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো ১৯৯৩ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত মুক্তিপ্রাপ্ত মৌসুমী অভিনীত ১৬৬টি চলচ্চিত্রের এক অবিশ্বাস্য ও সম্পূর্ণ ডিজিটাল খতিয়ান।

শুরুর বছর ও রাজকীয় অভিষেক (১৯৯৩)

১৯৯৩ সালে মাত্র ৩টি চলচ্চিত্র দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করলেও প্রথম ছবিতেই বাজিমাৎ করেন মৌসুমী।

  • কেয়ামত থেকে কেয়ামত (সহশিল্পী: সালমান শাহ, পরিচালক: সোহানুর রহমান সোহান) – ২৫.০৩.১৯৯৩ (ঈদুল ফিতর)

  • মৌসুমী (অমিত হাসান, পরিচালক: নাজমুল হুদা মিন্টু) – ২৪.০৯.১৯৯৩

  • দোলা (ওমর সানী, পরিচালক: দিলীপ সোম) – ০৩.১২.১৯৯৩ (যেখান থেকে ওমর সানীর সাথে বাস্তব জীবনের জুটির সূত্রপাত)

সালমান-সানী ও মৌসুমী ক্রেজ (১৯৯৪ – ১৯৯৫)

এই দুই বছরে মৌসুমী উপহার দেন একের পর এক সুপারহিট সিনেমা। যার মধ্যে সালমান শাহের সাথে ‘অন্তরে অন্তরে’ এবং ‘দেন মোহর’ ইতিহাস সৃষ্টি করে।

  • ১৯৯৪ সালের ছবি: আত্ম অহংকার (২২.০৪.৯৪), অন্তরে অন্তরে (১০.০৬.৯৪), স্নেহ (১৬.০৯.৯৪), বিদ্রোহী বধূ (২১.১০.৯৪), প্রথম প্রেম (৩০.১২.৯৪)।

  • ১৯৯৫ সালের ঈদ ধামাকা: ১৯৯৫ সালের ঈদুল ফিতরে মুক্তি পায় ‘দেন মোহর’ ও ‘ক্ষুধা’। একই বছরের ঈদুল আযহায় একই দিনে মৌসুমীর ৩টি ছবি মুক্তি পায়—‘ভাংচুর’, ‘মুক্তির সংগ্রাম’ ও ‘সংসারের সুখ দুঃখ’।

  • অন্যান্য (১৯৯৫): বিশ্বপ্রেমিক, আদরের সন্তান, শেষ রক্ষা, প্রিয় তুমি, লজ্জা।

চলচ্চিত্রের ব্যস্ততম সময় (১৯৯৬ – ২০০০)

নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে মৌসুমী ছিলেন নির্মাতাদের প্রথম পছন্দ। ইলিয়াস কাঞ্চন, রুবেল, মান্না এবং আমিন খানের সাথে জুটি বেঁধে তিনি নিয়মিত ব্লকবাস্টার উপহার দিয়েছেন।

  • ১৯৯৬ সালের উল্লেখযোগ্য ছবি: স্বজন (ঈদ), ঘাত প্রতিঘাত (ঈদ), হারানো প্রেম (ঈদ), রাক্ষস (ঈদ), বাঘিনী কন্যা, গরিবের রাণী, পাপের শাস্তি, সুখের স্বর্গ, আত্মত্যাগ, শয়তান মানুষ, ফাঁসির আসামী।

  • ১৯৯৭ সালের রেকর্ড ৫ ঈদ রিলিজ: ৯৭-এর ঈদুল ফিতরে মৌসুমীর রেকর্ড ৫টি ছবি একসঙ্গে মুক্তি পায়—জজ সাহেব, শান্তি চাই, গোলাগুলি, মিথ্যা অহংকার ও রূপসী রাজকন্যা। এছাড়া এ বছরই মুক্তি পায় কালজয়ী ছবি ‘লুটতরাজ’।

  • ১৯৯৮ – ১৯৯৯ (আম্মাজান অধ্যায়): ১৯৯৮ সালে উল্কা, বাপের টাকা, ত্যাজ্যপুত্র, রক্তের অধিকারের পর ১৯৯৯ সালে মুক্তি পায় ঢাকাই সিনেমার অন্যতম সেরা চলচ্চিত্র কাজী হায়াতের ‘আম্মাজান’ (২৫.০৬.১৯৯৯)। এছাড়া এ সময়ে মগের মুল্লুক, খবর আছে, ভণ্ড বাবা ছবিগুলো ব্যবসা সফল হয়।

  • ২০০০ সাল: চিটার নাম্বার ওয়ান (ঈদ), কষ্ট (ঈদ), আজ গায়ে হলুদ (ঈদ), কুখ্যাত খুনী (ঈদ) সহ মোট ১২টি সিনেমা মুক্তি পায় এই এক বছরে।

মৌসুমীর চলচ্চিত্রের পূর্ণাঙ্গ তালিকা (২০০১ – ২০২২)

নিচে ছক আকারে মৌসুমীর ক্যারিয়ারের মধ্যভাগ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত মুক্তিপ্রাপ্ত গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্রের তালিকা দেওয়া হলো:

সাল চলচ্চিত্রের নাম (প্রধান সহশিল্পী / মন্তব্য) পরিচালক
২০০১ পাঞ্জা, ভেজা বিড়াল, মুখোমুখি, তাণ্ডবলীলা, ঢাকাইয়া মাস্তান কাজী হায়াৎ, মনতাজুর রহমান আকবর ও অন্যান্য
২০০২ ভয়ানক সংঘর্ষ, মেজর সাহেব, মেঘলা আকাশ, উত্তেজিত, বিপদজনক, আলীবাবা, ভালোবাসার শত্রু, আর্তনাদ, ইতিহাস (বিশেষ শিল্পী), লাল দরিয়া, স্ত্রীর মর্যাদা, ওরা ভয়ংকর, আবার একটি যুদ্ধ, আঘাত পাল্টা আঘাত এফ আই মানিক, নার্গিস আক্তার, কাজী হায়াৎ ও অন্যান্য
২০০৩ চাই ক্ষমতা, সত্যের বিজয়, বীর সৈনিক, সত্য মিথ্যার লড়াই, দুই বধূ এক স্বামী, মিনিষ্টার, বৌয়ের সম্মান, বিগবস, স্ত্রী কেন শত্রু, রুস্তম, কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি (পরিচালক: মৌসুমী) মৌসুমী (পরিচালনা), দেলোয়ার জাহান ঝন্টু ও অন্যান্য
২০০৪ বাঘের বাচ্চা, খাইরুন সুন্দরী (মেগা হিট), স্বামী ছিনতাই এ কে সোহেল, সোহানুর রহমান সোহান
২০০৫ রক্তে আমার আগুন, মোল্লা বাড়ীর বউ (সুপারহিট), আমি জেল থেকে বলছি, সন্ত্রাসী মুন্না, গোলাপজান, মেহের নেগার, মাতৃত্ত, প্রতিবাদী মাষ্টার সালাউদ্দিন লাভলু, জাহিদ হোসেন, মালেক আফসারি
২০০৬ মায়ের মর্যাদা, ধ্রুবতারা, সোনার ময়না পাখি, জীবনের গল্প, হৃদয়ের কথা (বিশেষ শিল্পী), ওরে সাম্পানওয়ালা, দজ্জাল শ্বাশুড়ী, বিন্দুর ছেলে চাষী নজরুল ইসলাম, এস এ হক অলিক
২০০৭ বাংলার বউ, বৃষ্টি ভেজা আকাশ, সাজঘর, তুই যদি আমার হইতিরে, একজন সঙ্গে ছিল, এই যে দুনিয়া, বিয়াইন সাব, machineম্যান, এক বুক জ্বালা, শত্রু শত্রু খেলা শাকিব খান, রিয়াজ, ফেরদৌস, মান্না
২০০৮ বাবা আমার বাবা, অবুঝ শিশু, বধূ বরণ, স্বপ্নপূরণ, পাষাণের প্রেম ইলিয়াস কাঞ্চন, শহিদুল ইসলাম খোকন
২০০৯ হৃদয় থেকে পাওয়া, ময়নামতির সংসার, সাহেব নামে গোলাম মোহাম্মদ হোসেন জেমী, রাজু চৌধুরী
২০১০ গোলাপি এখন বিলাতে আমজাদ হোসেন (সহশিল্পী: মিঠুন চক্রবর্তী)
২০১১ কুসুম কুসুম প্রেম, দুই পুরুষ, প্রজাপতি চাষী নজরুল ইসলাম, মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজ
২০১৩ দেবদাস (চন্দ্রমুখী চরিত্র), কিছু আশা কিছু ভালবাসা চাষী নজরুল ইসলাম, মোস্তাফিজুর রহমান মানিক
২০১৪ তারকাঁটা (বিশেষ শিল্পী), এক কাপ চা মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজ, নঈম ইমতিয়াজ
২০১৫ আশিকী (বিশেষ শিল্পী) আবদুল আজিজ ও অশোক পাতি
২০১৬ ভালোবাসবোই তো, মন জানেনা মনের ঠিকানা বেলাল আহমেদ, মুশফিকুর রহমান গুলজার
২০১৭ দুলাভাই জিন্দাবাদ মনতাজুর রহমান আকবর (সহশিল্পী: ডিপজল)
২০১৮ আমি নেতা হবো, চিটাগাইঙ্গা পোয়া নোয়াখাইল্লা মাইয়া, পবিত্র ভালোবাসা, নায়ক, লিডার, পোস্টমাস্টার ৭১ উত্তম আকাশ, ইস্পাহানি আরিফ জাহান
২০১৯ রাত্রির যাত্রী, নোলক হাবিবুল ইসলাম হাবিব, সাকিব সনেট
২০২১ সৌভাগ্য এফ আই মানিক (সহশিল্পী: ডিপজল)
২০২২ ভাঙন, দেশান্তর মির্জা সাখাওয়াৎ হোসেন, আশুতোষ সুজন

অভিনয় ছাড়িয়ে পরিচালনা ও স্বীকৃতি

মৌসুমী শুধু ক্যামেরার সামনেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। ২০০৩ সালে তিনি নিজেই পরিচালনা করেন ‘কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি’ এবং ২০০৫ সালে ‘মেহের নেগার’। দীর্ঘ এই ক্যারিয়ারে তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে একাধিকবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননা লাভ করেছেন। ২০২২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ভাঙন’ ও ‘দেশান্তর’ চলচ্চিত্রে তার পরিপক্ক অভিনয় প্রমাণ করে—তিনি চিরসবুজ, তিনি ঢালিউডের প্রকৃত ‘প্রিয়দর্শিনী’।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 10   +   6   =