বিনোদন প্রতিবেদক | দৈনিক পূর্বাচল
প্রকাশিত: ২৯ জুন, ২০২৬
চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির আসন্ন নির্বাচন ঘিরে ৪০ জন নতুন সদস্যপদ দেওয়ায় তীব্র অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ। গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করে প্রার্থী ও নেতাদের স্ত্রী-সন্তানদের ভোটার বানানোর নেপথ্য খবর জানুন দৈনিক পূর্বাচলে।
ঢাকা: আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির বিরুদ্ধে গঠনতন্ত্রের ‘শর্ত লঙ্ঘন’ করে সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূতভাবে নতুন ৪০ জনকে পূর্ণ সদস্যপদ ও ভোটাধিকার দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলেছেন সমিতির সাধারণ সদস্যসহ সিনিয়র শিল্পীরা।
বলা হচ্ছে, বর্তমান কমিটির প্রভাবশালী নেতাদের মেয়ে, স্ত্রী এবং পরিচিতদের পদের প্রভাব খাটিয়ে পূর্ণ সদস্য বানানো হয়েছে; যাদের অনেকেরই গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংখ্যক সিনেমা মুক্তি পায়নি, এমনকি কারো কারো কোনো সিনেমাই মুক্তি পায়নি।
কী বলছে শিল্পী সমিতির গঠনতন্ত্র?
শিল্পী সমিতির গঠনতন্ত্রের ৫ (ক) ধারা অনুযায়ী:
“পূর্ণ সদস্যের তালিকায় বাংলাদেশে মুক্তিপ্রাপ্ত ন্যূনতম পাঁচটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে অবিতর্কিত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করিলে তিনি পূর্ণ সদস্য পদের জন্য আবেদন করিতে পারিবেন। কার্যকরী পরিষদে তার আবেদন গৃহীত হইলে তিনি পূর্ণ সদস্য পদ লাভ করিবেন এবং তিনি ভোটাধিকার সহ কার্যকরী পরিষদের যে কোন পদের জন্য যোগ্য বলিয়া বিবেচিত হইবেন। পূর্ণ সদস্য পদের জন্য আবেদনকারীকে পেশাগতভাবে অবশ্যই ‘চলচ্চিত্র অভিনয় শিল্পী’ হইতে হইবে।”
সিনেমা ২টি, কেউ আবার চেনেনই না!
অভিযোগ উঠেছে, সদস্যপদ পাওয়া নতুনদের তালিকায় অনেকেই রয়েছেন যাদের মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমার সংখ্যা মাত্র দুই বা তিন। আবার অনেকে আছেন যাদের কোনো সিনেমাই এখনো হলের মুখ দেখেনি।
মুন্না খান (সদস্য নং ৫৩৪): মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা মাত্র ২টি—‘ডার্ক ওয়ার্ল্ড’ এবং ‘তছনছ’।
জান্নাতুল ফেরদৌস সানঞ্জানা: নতুন সদস্যপদ পেলেও তার অভিনীত কোনো চলচ্চিত্র এখনো মুক্তিই পায়নি।
রোমানা নীড়: তিনি সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী জয় চৌধুরীর স্ত্রী। তার ৪টি সিনেমার কথা বলা হলেও হলের পর্দায় মুক্তি পেয়েছে মাত্র ২টি।
দেওয়ানজাদী তুসমি তায়েফ টুনটুনি: বর্তমান কমিটির সহ-সভাপতি ও বর্তমান প্যানেলের প্রার্থী ডি এ তায়েবের মেয়ে। শিশুশিল্পী হিসেবে তার মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা মাত্র ২টি—‘সোনাবন্ধু’ ও ‘আমার মা’। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কোনো শিশুশিল্পীর সুনির্দিষ্ট বয়স হওয়ার আগে পূর্ণ সদস্য বা ভোটার হওয়ার নিয়ম নেই।
এ ছাড়া মিয়া মোহাম্মদ সেলিম (মূলত প্রযোজক), সনিয়া অমিদ মিতু, সুস্মি রহমান, শাহ হুমায়রা হোসেন সুবহা, মো. মামুন, নজরুল ইসলাম রাজ, মোহাম্মদ মনির হোসেন যুবরাজসহ আরও বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ৫টি সিনেমা না করেই সদস্যপদ পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
‘পরিচিত আর টাকা থাকলেই সদস্য হওয়া যায়’
গঠনতন্ত্র লঙ্ঘনের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সমিতির সদস্য এবিএম সোহেল রশিদ বলেন, “আমাদের সময়ে ৫০-৬০টি সিনেমা করার পর, দুই-তিন বছর চেষ্টা করে মেম্বার হতে হয়েছিল। আর এখন নিয়ম ভাঙার সংস্কৃতি চলছে। কমিটির প্রভাবশালীরা পদের প্রভাব খাটিয়ে নিজেদের মেয়ে ও স্ত্রীদের মেম্বার বানাচ্ছেন। এজিএম-এ আমরা প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম, কিন্তু প্রভাবশালীদের সংখ্যা বেশি থাকায় কিছু করা যায়নি।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভোটাধিকার বঞ্চিত এক পুরাতন সদস্য ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সিনেমা করে নাই, কাজ করে না এমন অনেক নতুন সদস্য হয়েছে যাদের আমরা চিনিই না। পরিচিত আর টাকা থাকলেই এখানে সদস্য হওয়া যায়। অথচ আমরা পুরাতন সদস্য হয়েও চাঁদার টাকা দিতে না পারায় ভোট দিতে পারছি না।”
‘এটি ভীষণভাবে দুঃখজনক’: ওমর সানী
শিল্পী সমিতির সাবেক সহ-সভাপতি ও জনপ্রিয় অভিনেতা ওমর সানী এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সংবিধান বা গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সদস্য পদের জন্য ন্যূনতম ৫টি সিনেমায় কাজ করার সুনির্দিষ্ট ক্রাইটেরিয়া রয়েছে। তা ছাড়া সুনির্দিষ্ট বয়সের অবকাঠামো তৈরি হওয়ার আগে কোনো শিশুশিল্পী কোনোভাবেই শিল্পী সমিতির ভোটার বা পূর্ণ সদস্য হতে পারে না। বর্তমান কমিটি যেভাবে একের পর এক প্রশ্নের মুখে পড়ছে এবং গঠনতন্ত্র অমান্য করে সদস্য পদ দিচ্ছে, তা সিনিয়র শিল্পী হিসেবে বলব ভীষণভাবে দুঃখজনক।”
অভিযোগ অস্বীকার ও নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য
সব অভিযোগ সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছেন বর্তমান কমিটির সহ-সভাপতি ও প্রার্থী ডি এ তায়েব। তিনি দাবি করেন, “গঠনতন্ত্রের নিয়মের বাইরে কোনো সদস্য পদ যুক্ত হয়নি। শতভাগ আইনগত ও যুক্তিসঙ্গত না হলে আমার কেবিনেট কখনোই এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এসব কাল্পনিক কথা ছড়ানো হচ্ছে।”
এদিকে শিল্পী সমিতির নির্বাচন কমিশনার খোরশেদ আলম খসরু জানান, “এই সদস্য তালিকাটি শিল্পী সমিতি থেকে বাছাই করে আমাদের দেওয়া হয়েছে। আমাদের এখানে এই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ আসেনি।”
উল্লেখ্য, আগামী ৩ জুলাই শিল্পী সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এবারের নির্বাচনে মোট ৫৭৩ জন ভোটার দুটি প্যানেল থেকে তাদের পছন্দের প্রার্থী বেছে নেবেন। যার মধ্যে একটি প্যানেলে সভাপতি পদে লড়ছেন ফাইটার ও প্রযোজক আরমান এবং সাধারণ সম্পাদক পদে চিত্রনায়িকা রুমানা ইসলাম মুক্তি। অন্য প্যানেলে সভাপতি পদে শিবা সানু ও সাধারণ সম্পাদক পদে লড়ছেন জয় চৌধুরী।

