চকলেট বয় থেকে দাপুটে ভিলেন: ঢালিউড হিরো ওমর সানীর তিন দশকের মহাকাব্যিক রূপান্তর

বিনোদন ডেস্ক, দৈনিক পূর্বাচল:

রোমান্টিক হিরো থেকে দাপুটে খলনায়ক! তিন দশকে প্রায় ১৩০টি চলচ্চিত্রের খতিয়ানসহ চিত্রনায়ক ওমর সানীর ক্যারিয়ারের জানা-অজানা গল্প নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন দৈনিক পূর্বাচলে।

নব্বই দশকের ঢাকাই চলচ্চিত্রের এক সোনালী অধ্যায়ের নাম ওমর সানী। ১৯৮৮ সালে ‘মশাল’ চলচ্চিত্রে একজন কিশোর চরিত্র দিয়ে রূপালী পর্দায় যার আগমন, তিনি পরবর্তী সময়ে বলয় ভেঙে নিজেকে বারবার প্রমাণ করেছেন। প্রথম দিকে রোমান্টিক ‘চকলেট বয়’ হিসেবে দর্শকদের হৃদয়ে ঝড় তোলা এই নায়ক পরবর্তীতে নতুন ধারার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে দেশীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম দাপুটে এবং সফল ‘ভিলেন’ বা খলনায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রায় ১৩০টির কাছাকাছি চলচ্চিত্রে বৈচিত্র্যময় চরিত্রে অভিনয় করে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এক কালজয়ী অভিনেতা হিসেবে।

রোমান্টিক হিরো হিসেবে উত্থান ও ‘সানী-মৌসুমী’ জুটি

শেখ নজরুল ইসলামের ‘চাঁদের আলো’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে একক নায়ক হিসেবে বড় পর্দায় ওমর সানীর রাজকীয় অভিষেক ঘটে। এরপরই সুচিত্রার বিপরীতে ‘আমার জান’ ও ‘এই নিয়ে সংসার’ দিয়ে তিনি জানান দেন তার অমিত সম্ভাবনার কথা। তবে ওমর সানীর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট আসে ১৯৯৩ সালে দিলীপ সোমের ‘দোলা’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। এই ছবি থেকেই শুরু হয় বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম সফল ও জনপ্রিয় ‘ওমর সানী-মৌসুমী’ জুটির ঐতিহাসিক রসায়ন। পরবর্তীতে যা বাস্তবেও এক সুখী দাম্পত্য জীবনে রূপ নেয়।

চলচ্চিত্রের পরিসংখ্যান বলছে, ওমর সানীর ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বেশি দর্শকপ্রিয়তা এনে দিয়েছে মৌসুমীর সাথে জুটি। ‘আত্ম অহংকার’, ‘প্রথম প্রেম’, ‘মুক্তির সংগ্রাম’, ‘সংসারের সুখ দুঃখ’, ‘প্রিয় তুমি’, ‘লজ্জা’, ‘ঘাত প্রতিঘাত’, ‘হারানো প্রেম’, ‘গরিবের রাণী’, ‘সুখের স্বর্গ’, ‘ফাঁসির আসামী’, ‘শান্তি চাই’, ‘মিথ্যা অহংকার’, ‘লাট সাহেবের মেয়ে’, ‘স্নেহের বাঁধন’, ‘উল্কা’ কিংবা পরবর্তী সময়ের ‘সাহেব নামে গোলাম’ ও ‘আমি নেতা হবো’ পর্যন্ত প্রায় ৩০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে এই জুটির অনবদ্য রসায়ন দর্শককে হলমুখী করে রেখেছিল।

ঈদের ছবির একচ্ছত্র রাজা ও শাবনূর-পপি রসায়ন

নব্বইয়ের দশকে সিনেমা হলের ঈদের আনন্দ ওমর সানীর ছবি ছাড়া যেন জমতোই না। ১৯৯৩ সালের ঈদুল আযহায় ‘বাংলার বধূ’, ১৯৯৫ সালের ঈদুল ফিতরে ‘ক্ষুধা’, ১৯৯৬ ও ১৯৯৭ সালের ঈদুল ফিতরে পরপর ‘হারানো প্রেম’, ‘শান্তি চাই’, ‘গোলাগুলি’, ‘মিথ্যা অহংকার’ ও ‘রূপসী রাজকন্যা’র মতো ব্লকবাস্টার ছবি উপহার দিয়ে তিনি ছিলেন উৎসবের কেন্দ্রবিন্দুতে। মৌসুমী ছাড়াও শাবনূরের সাথে ‘প্রেমের অহংকার’, ‘কে অপরাধী’, ‘অধিকার চাই’, ‘মধুর মিলন’ এবং পপির সাথে ‘কুলি’ ও ‘আমার বউ’ চলচ্চিত্রে তার অভিনয় দারুণ প্রশংসিত হয়।

নায়কের খোলস ভেঙে ভিলেনের রূপ: ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ইনিংস

২০০০ সালের পর ঢালিউডের ধারার পরিবর্তনের সাথে সাথে ওমর সানীও নিজের অভিনয়ে আনেন এক যুগান্তকারী পরিবর্তন। নায়কের ইমেজ ভেঙে ২০০৩ সালের ঈদুল আযহায় উত্তম আকাশের ‘ওরা দালাল’ ছবির মাধ্যমে তিনি পুরোদস্তুর ভিলেন বা খলনায়ক হিসেবে পর্দায় হাজির হন। এই নতুন রূপ লুফে নেয় দর্শক।

পরপর ‘খালাস’, ‘যৌথ বাহিনী’, ‘আব্বাস দারোয়ান’, ‘নষ্ট’, ‘বাঁচাও দেশ’, ‘গাদ্দারী’, ‘জিদ্দি ড্রাইভার’, ‘দজ্জাল শ্বাশুড়ী’, ‘রিক্সাওয়ালার প্রেম’ ও ‘আমার প্রাণের স্বামী’র মতো সুপারহিট ছবিগুলোতে তার খল-অভিনয় ঢালিউডে নতুন সমীকরণ তৈরি করে। ভিলেন হিসেবে তার এই রাজত্ব ২০১০-১১ সাল পর্যন্ত একচ্ছত্রভাবে বজায় ছিল।

বিশেষ চরিত্রে প্রত্যাবর্তন ও আধুনিক সিনেমা

সময়ের সাথে সাথে ওমর সানী নিজেকে ‘বিশেষ শিল্পী’ বা ‘ক্যামিও’ চরিত্রেও দারুণভাবে মানিয়ে নিয়েছেন। মালেক আফসারীর ‘আমি জেল থেকে বলছি’, এফ আই মানিকের ‘মায়ের হাতে বেহেশতের চাবি’, কিংবা মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজের ‘প্রজাপতি’ ও নঈম ইমতিয়াজ নেয়ামুলের ‘এক কাপ চা’ ছবিতে তার সংক্ষিপ্ত কিন্তু শক্তিশালী উপস্থিতি দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘রান আউট’, ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেমকাহিনী ২’, ‘আইসক্রিম’ কিংবা ২০১৯ সালের ঈদুল ফিতরের বিগ বাজেট ছবি ‘নোলক’-এ তার পরিপক্ব অভিনয় প্রমাণ করে—বয়স বাড়লেও অভিনেতার ধার কমেনি বিন্দুমাত্র।

রোমান্টিক নায়ক থেকে শুরু করে অ্যাকশন হিরো, নিষ্ঠুর ভিলেন কিংবা দক্ষ চরিত্রাভিনেতা—সব রূপেই ওমর সানী ঢাকাই সিনেমার এক অপরিহার্য নাম। তিন দশকের এই দীর্ঘ যাত্রায় তিনি কেবল অভিনেতাই নন, হয়ে উঠেছেন বাংলা চলচ্চিত্রের এক জীবন্ত কিংবদন্তি।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 9   +   8   =